ভূমিকম্প সংঘটনের পূর্বে, ভূমিকম্পকালীন এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী করণীয়: প্রাতিষ্ঠানিক ও কমিউনিটি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ
ভূমিকম্প সংঘটনের পূর্বে, ভূমিকম্পকালীন
এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী করণীয়: প্রাতিষ্ঠানিক ও কমিউনিটি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সমন্বিত
বিশ্লেষণ
@মো:
আবদুর রহমান মিঞা
(লেখক,
গবেষক ও প্রাবন্ধিক)
১. ভূমিকা
ভূমিকম্প
পৃথিবীর অন্যতম ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে একটি দেশের
জনজীবন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে
সংকটে ফেলে দিতে পারে। ভূমিকম্পের অপ্রত্যাশিত ও হঠাৎ সংঘটিত হওয়ার বৈশিষ্ট্য
এটিকে আরও বিপদজনক করে তোলে, বিশেষ করে জনবহুল ও অবকাঠামোগতভাবে দুর্বল
রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে। উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা
ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হননি; ফলে আগাম
প্রস্তুতিই ঝুঁকি হ্রাসের একমাত্র কার্যকর উপায় (UNDRR, 2022)। দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলে, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে তা নির্ভর করে—দেশটির
প্রস্তুতি, অবকাঠামোর স্থায়িত্ব, মানুষের সচেতনতা, এবং প্রশাসনিক
প্রতিক্রিয়ার গতি—এই চারটি উপাদানের ওপর।
বিশ্বের উন্নত
রাষ্ট্রগুলো বহু দশক ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতি, ভূমিকম্প সহনশীল
বিল্ডিং কোড, জরুরি সাড়া প্রদানের দ্রুত ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং
কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর ফলে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও
নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও প্রাণহানি তুলনামূলক কম
থাকে। বিপরীতে, উন্নয়নশীল দেশগুলো—বিশেষত
বাংলাদেশ, নেপাল বা ইন্দোনেশিয়া—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নির্মাণ কাঠামো, ঝুঁকি সম্পর্কে
সীমিত জ্ঞান এবং জরুরি সেবা কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে
রয়েছে (IFRC, 2021)। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব, সংকীর্ণ শহুরে পরিবেশ, দুর্বল
ভবন নির্মাণ এবং উদ্ধার-উপকরণের অপ্রতুলতা—সব মিলিয়ে
ভূমিকম্পের প্রভাব এখানে বহু গুণ বেশি হতে পারে।
দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তিনটি ধাপ অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ—
১) ভূমিকম্প-পূর্ব ঝুঁকি হ্রাস ও প্রস্তুতি,
২) ভূমিকম্প সংঘটনের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সাড়া, এবং
৩) ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন।
এই তিনটি ধাপকে
বলা হয় "সমন্বিত ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা কাঠামো", যা মূলত মানুষের
জীবনরক্ষা এবং ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য পরিকল্পিত। বৈশ্বিকভাবে
স্বীকৃত এই কাঠামো মানুষকে সচেতন করে, প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত করে এবং প্রযুক্তিকে
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করে।
বাংলাদেশের
ক্ষেত্রে ভূমিকম্প ঝুঁকি একটি বাস্তব ও ধারাবাহিক হুমকি। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান
দক্ষিণ এশিয়ার সক্রিয় টেকটোনিক অঞ্চলের উপর হওয়ায় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনার
বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন। এর পাশাপাশি নগরায়ণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে
ঝুঁকিও বাড়ছে। অপরিকল্পিত ভবন, সংকীর্ণ সড়ক, অগ্নিনির্বাপণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং
দুর্বল নির্মাণ তদারকি বড় মাত্রায় ক্ষতির সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়ায় (UNDRR, 2022)।
তাই বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষণা, নীতি, প্রশাসন, প্রযুক্তি এবং
জনগণের প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি।
এই প্রবন্ধে
প্রথমে ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করা হবে, এরপর বাংলাদেশে ভূমিকম্প
ঝুঁকির কারণ ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হবে। পরে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি,
কমিউনিটি পর্যায়ের প্রস্তুতি, এবং ভূমিকম্পের আগে–চলাকালীন–পরে করণীয় বিষয়ে
বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত ধারণা উপস্থাপন করা হবে—যা
ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়কে একটি টেকসই ও কার্যকর
ভূমিকম্প-ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
২. ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক
পটভূমি
ভূমিকম্প
পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও ভূ-গতিশীলতার একটি প্রাকৃতিক ফল, যা পৃথিবীর লিথোস্ফিয়ার
বা ভূত্বকের টেকটোনিক কার্যকলাপের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠ কঠিন মনে হলেও
তা আসলে কয়েকটি বিশাল প্লেটের সমন্বয়ে গঠিত, যেগুলো জিওথার্মাল শক্তির কারণে
ক্রমাগত নড়াচড়া করছে। এই প্লেটগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষ, একে অপরের ওপর স্লাইড করে
যাওয়া, কিংবা দূরে সরে যাওয়া—প্রত্যেক ধরনের গতিবিধিই মাটির নিচে চাপ (stress) সৃষ্টি করে।
চাপ একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছালে শিলাস্তর তা ধরে রাখতে পারে না এবং হঠাৎ ভেঙে
গিয়ে সঞ্চিত শক্তি তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে—এটাই ভূমিকম্প
(USGS, 2023)।
ভূমিকম্পের
উৎপত্তিস্থলকে বলা হয় hypocenter
বা focus এবং ভূ-পৃষ্ঠের ঠিক
ওপরে বিন্দুটিকে বলা হয় epicenter।
যেখানে চাপের সঞ্চয় বেশি, সেই ফাটলের রেখা (fault line) বরাবরই সাধারণত ভূমিকম্প
ঘটে। পৃথিবীর ভিতরে উৎপন্ন কম্পন তরঙ্গ (seismic waves) দুই ধরনের—body waves
এবং surface waves। P-waves এবং S-waves দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ধীরগতির surface waves, কারণ এগুলো ভূ-পৃষ্ঠের
দিকে শক্তি প্রবাহিত করে কাঠামোকে কাঁপিয়ে দেয় (Stein & Wysession, 2009)।
ভূমিকম্পে মানবিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে এই তরঙ্গের গতি,
ভূমিকম্পের মাত্রা, গভীরতা, ভূমির প্রকৃতি ও জনসংখ্যার ঘনত্বের ওপর।
দক্ষিণ এশিয়া
ভূমিকম্পের জন্য একটি অত্যন্ত সক্রিয় অঞ্চল, কারণ এটি ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান
প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের
জটিল আন্তঃক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত একটি সক্রিয় সাবডাকশন জোনে অবস্থিত (Khan &
Islam, 2020)। ভারতীয় প্লেট প্রতি বছর প্রায় ৪–৬ সেন্টিমিটার হারে উত্তরে এগিয়ে
ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঠেলে দিচ্ছে, যার ফলে হিমালয় অঞ্চল ধীরে ধীরে উঁচু হচ্ছে
এবং একই সঙ্গে বিশাল ভূ-চাপ সঞ্চিত হচ্ছে। এই চাপকেই ভূমিকম্প হিসেবে প্রকাশ পেতে
সময় লাগে না।
আঞ্চলিক সিসমিক
রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, গত ৩০০ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ভূমিকম্প
ঘটেছে, যেমন—১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প, ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প ও
১৯৫০ সালের তিব্বত–আসাম ভূমিকম্প—যা ব্যাপক ভূমিধস, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং জনজীবনে বিপর্যয়
ঘটিয়েছিল (Bilham, 2019)। বাংলাদেশের ভূত্বকের নিচেও বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্টলাইন
রয়েছে—যেমন
ঢাকা ফল্ট, সিলেট–মেঘালয় ফল্ট, চট্টগ্রাম–মরমা ফল্ট—যেগুলোর ভূ-চাপ
দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে
দেওয়া যায় না।
ভূমিকম্পের
বৈজ্ঞানিক মডেলিং দেখায় যে, বাংলাদেশের মাটি প্রধানত অ্যালুভিয়াল এবং নরম
স্তরবিশিষ্ট হওয়ায় ভূমিকম্প হলে ‘site amplification’ বা কম্পন বৃদ্ধির ঘটনা ঘটতে
পারে (Ansary & Rahman, 2021)। ফলে ভূমিকম্পের মাত্রা মাঝারি হলেও ক্ষয়ক্ষতি
তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণে অপর্যাপ্ত বিল্ডিং
কোড প্রয়োগ, ঘনবসতি, এবং বড় শহরগুলোর ভূগর্ভস্থ গ্যাস–পানি–বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের
দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সুতরাং,
ভূমিকম্প শুধু একটি ভূ-প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং পৃথিবীর গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের
ধারাবাহিক প্রকাশ, যার বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া, প্রযুক্তিগত
প্রস্তুতি এবং মানবসম্পদের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
৩. বাংলাদেশের ভূমিকম্প
ঝুঁকি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত, কারণ দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব এবং
দক্ষিণ-পূর্ব অংশ সক্রিয় টেকটোনিক ফল্টলাইন দ্বারা পরিবেষ্টিত। দেশের ভৌগোলিক
অবস্থান তিনটি প্রধান প্লেটের সংযোগস্থলে হওয়ায় ভূমিকম্প ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই
বেশি। উপরন্তু, ভূ-পৃষ্ঠের নরম অ্যালুভিয়াল গঠন কম্পনকে বৃদ্ধি করে, যা একই
মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় (Ansary & Rahman, 2021)।
বাংলাদেশের নগরায়ণ ধারা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং অত্যধিক জনঘনত্ব এই ঝুঁকিকে আরও
তীব্র করেছে।
ঢাকা,
চট্টগ্রাম ও সিলেট দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নগরী হিসেবে চিহ্নিত। ঢাকার জনসংখ্যা
প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৭,০০০ (BBS, 2022), যা পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ
নগরীর মধ্যে পড়ে। এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধার, অগ্নিনির্বাপন বা জরুরি সেবা
পৌঁছাতে স্বাভাবিকভাবেই বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়। ঢাকার বড় অংশেই রয়েছে সরু গলি,
অপরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, এবং পুরনো দালান বা ভবন—যেগুলোর
অধিকাংশই বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC, 2020) অনুযায়ী নির্মিত নয়। ফলে
মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই এসব ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশ্বব্যাংকের
একটি গবেষণা (World Bank, 2021) দেখায় যে, ঢাকার প্রায় ৭০% ভবন মাঝারি বা বড়
মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই হিসাব শুধু ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতার
ওপর ভিত্তি করে নয়; এতে রাস্তা–ঘাটের অপ্রতুলতা, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ লাইনের
দুর্বলতা এবং অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাবনাকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে ন্যূনতম
উন্মুক্ত মাঠ বা নিরাপদ সমাবেশস্থলের অভাবও ভূমিধস, ভবনধস বা অগ্নিকাণ্ড পরবর্তী
উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলবে।
চট্টগ্রাম
অঞ্চল বাংলাদেশের টেকটোনিকভাবে সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। চট্টগ্রাম এবং
পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচ দিয়ে বিস্তৃত রয়েছে বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্টলাইন, যার
মধ্যে চাটগাঁ ফল্ট, চট্টগ্রাম–মারমা ফল্ট উল্লেখযোগ্য (Ahmed et al., 2020)। এ
অঞ্চলে ঘনবসতিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা, দুর্বল সড়ক নেটওয়ার্ক এবং পাহাড়ধস–সংক্রান্ত
ঝুঁকিও যুক্ত হয়, ফলে ভূমিকম্পের ক্ষতি বহুগুণে বাড়তে পারে।
সিলেট অঞ্চলও
দীর্ঘদিন ধরে সিসমিক জোন–৩ হিসেবে চিহ্নিত। সম্প্রতি এ অঞ্চলে বারবার কম মাত্রার
কম্পন অনুভূত হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে একটি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে বা
জমে থাকা ভূ-চাপের ইঙ্গিত (Khan & Alam, 2021)। সিলেট শহরে প্রচুর পুরনো দালান
বা ভবন, ভঙ্গুর মাটির স্তর, এবং অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের কারণে ক্ষয়ক্ষতির
সম্ভাবনা বেশি।
আরেকটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের ভূগর্ভে GNSS এবং সিসমিক মডেলিং পরীক্ষায় দেখা গেছে
যে, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিচে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূ-চাপ সঞ্চিত
হচ্ছে, যা বড় ধরনের স্লিপ ইভেন্ট ঘটাতে পারে (Steckler et al., 2016)। এই চাপ কখন
মুক্ত হবে এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
গ্রামীণ
এলাকাতেও ঝুঁকি কম নয়। অধিকাংশ গ্রামীণ ঘরবাড়ি নরম মাটি, ইট–সিমেন্টবিহীন কাঠামো
বা টিন–কাঠের তৈরি হওয়ায় কম্পনের ফলে দেয়াল ধস, ফাটল বা পাইপলাইনের ক্ষতির
সম্ভাবনা থাকে। দুর্যোগ পরবর্তী সেবা যেমন অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপন এবং
নিরাপদ আশ্রয়স্থলের ঘাটতি সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
অতএব,
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি তিনটি প্রধান উপাদান দ্বারা তীব্রতর হয়েছে—
১) টেকটোনিক সক্রিয়তা,
২) ঘন জনসংখ্যা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এবং
৩) দুর্বল অবকাঠামো ও সীমিত জরুরি প্রতিক্রিয়াশক্তি।
এই বাস্তবতা
বাংলাদেশকে একটি ভূমিকম্প-সহনশীল রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে প্রাতিষ্ঠানিক নীতি,
অবকাঠামো বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির
প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি
ভূমিকম্পের মতো উচ্চ-মাত্রার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
কেবল ব্যক্তিগত বা কমিউনিটি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতি, অবকাঠামোগত
সক্ষমতা, অভিযোজন-প্রযুক্তি, এবং সমন্বিত জরুরি প্রতিক্রিয়ার ওপর গভীরভাবে
নির্ভরশীল। বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে
প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে; তবে ভূমিকম্পের মতো হঠাৎ ও বড় আকারের বিপর্যয়ের মোকাবিলায়
এখনও আরও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
৪.১ নীতি-নির্দেশনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
কাঠামো
বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম প্রধানত
তিনটি নীতিগত কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়:
১. ন্যাশনাল
ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট নীতি (NDMP)
এই নীতির লক্ষ্য হলো দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, প্রস্তুতি, প্রতিক্রিয়া এবং পুনরুদ্ধার
কার্যক্রমে একীভূত ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা। এতে ভূমিকম্পকে একটি
উচ্চ-ঝুঁকির দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তব মাঠপর্যায়ে এর জন্য বিশেষায়িত
ফান্ড, কাঠামো এবং পরিকল্পনা এখনও সীমিত।
২. ন্যাশনাল
প্ল্যান ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (২০২১–২০২৫)
এ পরিকল্পনায় ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন, নগর এলাকায় সিসমিক রেট্রোফিটিং, জরুরি
প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব
দেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়
ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের অভাব।
৩. স্ট্যান্ডিং
অর্ডার অন ডিজাস্টার (SOD, 2020)
SOD দুর্যোগের পূর্বে, চলাকালীন এবং পরে কোন সংস্থার কী দায়িত্ব—তা নির্দিষ্ট করে দেয়। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এটি
জাতীয় পর্যায়ে ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার সক্রিয়করণ, স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি
সমন্বয়, উদ্ধারদল মোতায়েন, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতকরণ ইত্যাদি নির্দেশনা প্রদান
করে। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় দেখা যায় যে অনেক প্রতিষ্ঠান ভূমিকম্প-সংক্রান্ত SOP
সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে প্রশিক্ষিত নয়।
এই কাঠামোগুলোর অগ্রগতি থাকলেও, ভূমিকম্প
ব্যবস্থাপনায় মূল সমস্যা হলো—
·
বিশেষায়িত
প্রশিক্ষণের অভাব,
·
ভূমিকম্প
প্রস্তুতির জন্য আলাদা বাজেটের স্বল্পতা,
·
সংস্থা–সংস্থার
মধ্যে সমন্বয়হীনতা,
·
এবং
তথ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নের ঘাটতি।
ফলে নীতিমালা থাকলেও তা কার্যকর করতে আরও
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
৪.২ বিল্ডিং কোড ও নির্মাণ তদারকি
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC, 2020) দেশে
ভূমিকম্প সহনশীল নির্মাণের জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা। এতে—
·
ভবনের ভিত্তি
নকশা,
·
সিসমিক লোডের
মান নির্ধারণ,
·
উপকরণের
গুণমান,
·
উচ্চতা-ভিত্তিক
কাঠামো নকশা,
·
রেট্রোফিটিং প্রক্রিয়া
ইত্যাদি বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্দেশনা
দেওয়া হয়েছে।
তবে এর বাস্তবায়নে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে:
১. নির্মাণ
খাতে অস্বচ্ছতা ও তদারকির অভাব
অনিয়ন্ত্রিত ডেভেলপার, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের কারণে BNBC-এর অনেক
নিয়মই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
২. স্থানীয়
সরকার পর্যায়ের দক্ষ জনবলের ঘাটতি
শহর ও পৌরসভাগুলোতে পর্যাপ্ত প্রকৌশলী বা টেকনিক্যাল তদারকি কর্মকর্তা নেই, ফলে
নির্মাণ অনুমোদন ও মান যাচাই অসম্পূর্ণ থাকে।
৩. পুরোনো
ভবনের রেট্রোফিটিং উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা
দেশের অধিকাংশ পুরানো ভবন সিসমিক মানদণ্ড মেনে নির্মিত হয়নি। এগুলোকে ভূমিকম্প
সহনশীল করতে রেট্রোফিটিং জরুরি, কিন্তু নির্মাণ খরচ, মালিকদের অনাগ্রহ এবং আইনি
দুর্বলতার কারণে প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে ধীরে।
৪. জনসচেতনতার
অভাব
অনেক মানুষ এখনো মনে করেন—ভূমিকম্পে
ক্ষতি “নিয়তি”—যা নির্মাণ নিরাপত্তায়
বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন কঠোর তদারকি, নির্মাণ
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল মনিটরিং, এবং পুরোনো ভবনগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন।
৪.৩ জরুরি প্রতিক্রিয়া ইউনিট
বাংলাদেশে ভূমিকম্পের পর জরুরি প্রতিক্রিয়া
পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব পালন করে—
·
ফায়ার
সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স,
·
সেনাবাহিনী,
·
বাংলাদেশ
পুলিশ,
·
রেড
ক্রিসেন্ট,
·
স্বেচ্ছাসেবী
সংগঠন ও কমিউনিটি রেসপন্স টিম,
·
স্বাস্থ্য
বিভাগ,
·
স্থানীয়
প্রশাসন।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার উন্নতির ক্ষেত্রে যে
বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ:
১. সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন
উদ্ধারকাজে প্রয়োজন—
·
রেসকিউ
কাটার,
·
লাইফ ডিটেকশন
ডিভাইস,
·
ড্রোন–ভিত্তিক
ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন ব্যবস্থা,
·
রুবল সার্চ
প্রযুক্তি,
·
সিসমিক
মনিটরিং সিস্টেম
ইত্যাদি।
বর্তমানে সরঞ্জাম থাকলেও সংখ্যায় সীমিত এবং রক্ষণাবেক্ষণেও ঘাটতি রয়েছে (IFRC,
2021)।
২. দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি
বহু উদ্ধারকর্মীর আগুন নেভানো বা বন্যা মোকাবিলায়
দক্ষতা থাকলেও ভূমিকম্প উদ্ধার প্রশিক্ষণ তুলনামূলক কম।
ভবনধসে আটকে পড়া মানুষের উদ্ধার (Urban Search and Rescue – USAR) বিশেষায়িত
দক্ষতা, যা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
৩. আন্তঃসংস্থা সমন্বয়
দুর্যোগের সময় সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও
স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, অনুশীলন কম হওয়ায় কমান্ড সিস্টেম প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
৪. নিয়মিত মহড়া (drill)
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বড় পরিসরে মহড়া হয়,
কিন্তু সেগুলো বছরের একবার হয় এবং বাস্তব পরিস্থিতির মতো বিস্তৃত হয় না। কমিউনিটি
পর্যায়ের মহড়াও নিয়মিত নয়।
৫. হাসপাতাল প্রস্তুতি
Earthquake Mass Casualty Management-এর মতো
কার্যক্রম খুবই সীমিত। অনেক হাসপাতালের বিল্ডিং নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি
কাঠামো নীতিগতভাবে শক্তিশালী হলেও, বাস্তব প্রয়োগে এখনও দক্ষতা, প্রযুক্তি, তদারকি
এবং সমন্বয়—এই চারটি ক্ষেত্রে বড়
বিনিয়োগ ও সংস্কার প্রয়োজন।
৫. কমিউনিটি পর্যায়ের প্রস্তুতি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ দেশগুলো প্রমাণ করেছে
যে, স্থানীয় জনগণই যে কোনো দুর্যোগে প্রথম প্রতিক্রিয়াকারী। তাই জাতীয় বা
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যতই শক্তিশালী হোক, কমিউনিটি প্রস্তুতি দুর্বল হলে
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এজন্য
কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (CBDRR) এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মডেল
(UNDRR, 2022)। বাংলাদেশেও বিভিন্নভাবে সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে,
তবে তা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
৫.১ সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ
সচেতনতা বাড়ানোর কাজটি কেবল তথ্য প্রদান নয়; বরং
মানুষের আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করা। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্ক, ভুল প্রতিক্রিয়া বা
গুজব প্রাণহানি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কমিউনিটির প্রতিটি সদস্যকে যথাযথভাবে
শিক্ষিত করা জরুরি।
১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মহড়া
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া
(Earthquake Drill) শিশু-কিশোরদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিরাপদ জায়গায় আশ্রয়
নেওয়া, সিঁড়ি ব্যবহার, এবং “ডাক–কভার–হোল্ড” কৌশল শেখাতে সহায়তা করে।
এ ছাড়াও শিক্ষক ও কর্মচারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ তাদেরকে জরুরি পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব
দিতে সক্ষম করে।
২. কমিউনিটি সেন্টার ও মসজিদ–মন্দির–গির্জায় প্রশিক্ষণ ও আলোচনা
স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব কমিউনিটি প্রস্তুতিতে
অত্যন্ত কার্যকর। তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ইমাম, পুরোহিত, শিক্ষক ও সিভিল সোসাইটি
সদস্যদের নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম জনগণের আস্থা বৃদ্ধি ও তথ্য প্রচারে সহায়তা
করে।
৩. গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচারণা
টিভি, রেডিও, পত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মোবাইল
ম্যাসেজিংয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি, নিরাপদ আচরণ, ও গুজব প্রতিরোধের নির্দেশনা
ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু গুজব বা ভুল তথ্য দুর্যোগের সময় বেশি
দ্রুত ছড়ায়, তাই সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
৪. পরিবারভিত্তিক পরিকল্পনা (Family Emergency Plan)
প্রতিটি পরিবারের উচিত—
·
জরুরি
যোগাযোগ নম্বর সংরক্ষণে রাখা,
·
পরিবারের
সদস্যদের মধ্যে পূর্ব থেকেই দুর্যোগকালীন কাজ বণ্টন করা,
·
নিরাপদ স্থান
চিহ্নিত করা,
·
ঘরের দুর্বল
স্থাপনা পরীক্ষা করা।
পরিবার-স্তরের প্রস্তুতি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা
পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫.২ জরুরি প্রস্তুতি সবার জন্য
ভূমিকম্প হঠাৎ ঘটে এবং উদ্ধারকাজ সবসময় দ্রুত শুরু
হয় না। তাই প্রাথমিক ২৪–৭২ ঘণ্টা টিকে থাকার জন্য প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব
প্রস্তুতি অপরিহার্য।
১. জরুরি ব্যাগ (Emergency Go-Bag)
একটি পরিবারে প্রতিজনের জন্য প্রস্তুত জরুরি ব্যাগ
থাকা উচিত, যাতে থাকে—
·
পানির বোতল,
·
শুকনো খাবার,
·
প্রয়োজনীয়
ওষুধ,
·
পরিচয়পত্রের
কপি,
·
গুরুত্বপূর্ণ
নথি,
·
টর্চলাইট,
·
ব্যাটারি,
·
মোবাইলের
পাওয়ার ব্যাংক,
·
সিটি বা
হুইসল,
·
স্যানিটারি
সামগ্রী।
এই ব্যাগ এমন স্থানে রাখা উচিত, যেখান থেকে দ্রুত
বের করে নেওয়া যায়।
২. প্রাথমিক চিকিৎসা দক্ষতা
কমিউনিটির সদস্যদের CPR, রক্ত বন্ধ করা, হাড় ভাঙা
শনাক্ত করা, ও প্রাথমিক ব্যান্ডেজ লাগানোর মতো মৌলিক চিকিৎসা শিখলে
ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে আহত ব্যক্তিদের জীবন রক্ষা করা সহজ হয়।
৩. নিরাপদ খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ
ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে খাদ্য ও পানির সংকট দেখা
দিতে পারে। তাই কমিউনিটিতে বাড়িভিত্তিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, টিউবওয়েল বা কূপের
সুরক্ষা, এবং খাদ্য মজুতের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
৪. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য প্রস্তুতি
শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও
দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের প্রয়োজন আলাদা। তাই কমিউনিটি পরিকল্পনায় তাদের—
·
ওষুধ,
·
হুইলচেয়ার,
·
সহায়তাকারী
সদস্য,
·
নিরাপদ আশ্রয়
কেন্দ্র
ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি।
৫. কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক দল (Community Volunteer Corps)
স্থানীয় তরুণরা প্রশিক্ষণ নিয়ে কমিউনিটি রেসপন্স
টিম গঠন করলে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার, তথ্য প্রচার, এবং জরুরি সহায়তা অনেক দ্রুত
ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
৫.৩ প্রস্তুতির কার্যকারিতা: গবেষণার
প্রমাণ
ভূমিকম্প-প্রবণ দেশগুলোর গবেষণা দেখিয়েছে যে—
·
পূর্বপ্রস্তুতি
থাকলে সামগ্রিক ক্ষতি ৫০%
বা তার বেশি কমে (Shaw et
al., 2018)।
·
কমিউনিটি
মহড়া মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ৪০%
পর্যন্ত কমায়।
·
পরিবারভিত্তিক
প্রস্তুতি আহত বা নিহত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে
উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করে।
·
গণমাধ্যম–নির্ভর
সচেতনতা আতঙ্ক ও গুজব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এর ফলে স্পষ্ট যে, কমিউনিটি প্রস্তুতি কেবল একটি
সহায়ক উপাদান নয়; বরং ভূমিকম্প মোকাবিলার কেন্দ্রীয় শক্তি।
৬. ভূমিকম্পের পূর্বে করণীয়
ভূমিকম্পের আগে নেওয়া প্রস্তুতি যেকোনো দেশের
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ ক্ষয়ক্ষতি কমানোর
সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ঝুঁকি
হ্রাসমূলক আগাম প্রস্তুতি।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমিকম্পের আগে সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণ করলে
প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব (UNDRR, 2022)। বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপটে পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ বৈশ্বিক
মানদণ্ডে একটি কার্যকর আগাম প্রস্তুতি কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
৬.১ ভবন ও গৃহস্থালি প্রস্তুতি
ভূমিকম্পের সময় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে ভবনের
অভ্যন্তরে থাকা অসুরক্ষিত উপাদানের কারণে। তাই ঘর ও ভবনকে ভূমিকম্প-সহনশীল করে
তোলা জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নির্দেশনা (যেমন CDC, FEMA) অনুযায়ী
নিম্নোক্ত প্রস্তুতি জীবন রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর:
১. কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই
·
ভবনটি BNBC
(2020) অনুযায়ী নির্মিত কি না—এটি
পেশাদার প্রকৌশলীর মাধ্যমে নিরীক্ষা করা।
·
পুরনো বা
ক্ষতিগ্রস্ত ভবন সংস্কার করে ভূমিকম্প-সহনশীল রেট্রোফিটিং নিশ্চিত করা।
·
কলাম, বীম ও
স্ল্যাবের ফাটল থাকলে তা অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।
২. আসবাবপত্রের স্থিতিশীলতা
·
বুকশেলফ,
আলমারি, ডিসপ্লে ক্যাবিনেটগুলো শক্ত স্ক্রু দিয়ে দেয়ালে আটকানো।
·
শোবার ঘরে
ভারী জিনিস মাথার দিক থেকে দূরে রাখা—যাতে
ঘুমের সময় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
·
ফ্রিজ, ওভেন,
টিভির মতো ভারী যন্ত্রপাতি অ্যান্টি-টিপিং ব্র্যাকেট দিয়ে স্থির করা।
৩. গ্যাস ও বৈদ্যুতিক লাইনের ঝুঁকি হ্রাস
·
গ্যাস লাইন
থেকে লিকেজ পরীক্ষা করা—রাবার পাইপের
পরিবর্তে ভালো মানের মেটেরিয়াল ব্যবহার করা।
·
বৈদ্যুতিক
সার্কিটে অটোমেটিক ব্রেকার স্থাপন করা—যাতে
ভূমিকম্পের সময় শর্ট সার্কিটের ঝুঁকি কমে।
·
সিলিন্ডার
ব্যবহৃত হলে তা সবসময় খাড়া অবস্থায় ও বায়ুচলাচলযুক্ত জায়গায় রাখা।
৪. জরুরি নির্গমনপথ প্রস্তুত করা
·
বাড়ির সিঁড়ি,
করিডোর, বারান্দা—এগুলোতে কোনো বাধা
বা ভিড় জমতে পারে এমন জিনিস না রাখা।
·
ফ্ল্যাট
বাসায় থাকলে জরুরি বহির্গমন (fire exit) সবসময় খোলা ও ব্যবহারযোগ্য থাকা।
·
প্রতিটি
পরিবারের সদস্যকে নির্গমনের পথ সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করা।
৫. ঘরের নিরাপদ স্থান চিহ্নিতকরণ
·
শক্ত টেবিল,
ডেস্ক বা বিছানার নিচে আশ্রয় নেওয়ার অনুশীলন।
·
জানালা, কাচ,
ভারী পেইন্টিং, ঝাড়বাতি—এসব থেকে দূরে
থাকার স্থান নির্ধারণ।
·
ভূমিকম্পের
সময় ‘Drop–Cover–Hold’ অভ্যাস গড়ে তুলতে নিয়মিত মহড়া করা।
৬.২ পরিবারভিত্তিক পরিকল্পনা
ভূমিকম্পের সময় বিভ্রান্তি কমাতে পরিবারের প্রতিটি
সদস্যের জন্য পূর্বপরিকল্পিত আচরণপদ্ধতি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. নির্দিষ্ট মিলনস্থল নির্ধারণ
·
বাসার বাইরে
নিরাপদ খোলা জায়গা যেমন—প্রাঙ্গণ,
খেলার মাঠ বা ফাঁকা পার্ককে মিলনস্থল হিসেবে নির্ধারণ।
·
সবাইকে
জানানো—ভূমিকম্প থামার পর কোথায় মিলিত
হতে হবে।
২. ঝুঁকিপ্রবণ সদস্যদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা
·
শিশুদের জন্য
ভূমিকম্পের সময় করণীয় সহজ ভাষায় শেখানো।
·
বৃদ্ধ ও
প্রতিবন্ধী সদস্যদের জন্য—হুইলচেয়ার,
ওয়াকার, প্রয়োজনীয় ওষুধ—সবকিছু কাছাকাছি
প্রস্তুত রাখা।
·
পরিবারের
মধ্যে এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যিনি জরুরি মুহূর্তে এসব সদস্যকে সহায়তা করবেন।
৩. জরুরি যোগাযোগ তালিকা হালনাগাদ রাখা
·
পরিবার,
প্রতিবেশী, স্থানীয় প্রশাসন, নিকটস্থ হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস—সবার নম্বর লিখে ঘরে দৃশ্যমান স্থানে লাগানো বা
ঝুলিয়ে রাখা।
·
মোবাইলে SOS
কন্টাক্ট অপশন সক্রিয় করা।
·
পরিবারের
সদস্যদের শেখানো—SMS পাঠানো বা
ইন্টারনেট ভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করা অনেক সময় বেশি কার্যকর, কারণ ভূমিকম্পের পর
মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
৪. জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত করা (Go-Bag)
জরুরি ব্যাগে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে—
·
পানির বোতল
(প্রতি ব্যক্তি অন্তত ১ লিটার),
·
শুকনো খাবার,
·
ফার্স্ট এইড
বক্স,
·
প্রয়োজনীয়
ওষুধ,
·
টর্চলাইট ও
অতিরিক্ত ব্যাটারি,
·
হুইসেল,
·
পাওয়ার
ব্যাংক,
·
নথিপত্রের
ফটোকপি (জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম সনদ, জমির কাগজ ইত্যাদি)।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি পরিবারের জরুরি ব্যাগ
প্রস্তুত থাকলে দুর্যোগ-পরবর্তী প্রথম ২৪–৪৮ ঘণ্টায় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা
উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে (Shaw et al., 2018)।
৬.৩ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
বাংলাদেশের অধিকাংশ অফিসে এখনও ভূমিকম্প প্রস্তুতি
তেমন গুরুত্ব পায় না। অথচ একটি প্রতিষ্ঠান যদি আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়, কর্মীদের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপারেশনাল ক্ষতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
১. নিয়মিত মহড়া (Mock Drill) আয়োজন
·
অফিসে বছরে
কমপক্ষে ২ বার ভূমিকম্প ও অগ্নিনির্বাপণ মহড়া বাধ্যতামূলক করা।
·
কর্মীদের
‘Drop–Cover–Hold’ অনুশীলন শেখানো।
·
মহড়ায় ফায়ার
সার্ভিস বা স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের যুক্ত করা।
২. নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রদর্শন
·
প্রতিটি তলায়
দৃশ্যমান জায়গায়–
o জরুরি নির্গমন পথ,
o অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের অবস্থান,
o ভূমিকম্পের সময় করণীয়
—এসব প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা।
·
নির্দেশিকাগুলো
দুই ভাষায় (বাংলা ও ইংরেজি) দেওয়া উচিত, যাতে সবাই বুঝতে পারে।
৩. জরুরি সরঞ্জাম সংরক্ষণ
·
অগ্নিনির্বাপণ
যন্ত্র, স্ট্রেচার, ফার্স্ট এইড বক্স, ধুলাবালি প্রতিরোধী মাস্ক, গ্লাভস, হেলমেট
এগুলো সবসময় ব্যবহার উপযোগী রাখা।
·
ব্যাকআপ
জেনারেটর, আলো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা।
৪. ভবনের ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment)
·
অফিস ভবনটি
BNBC অনুযায়ী নির্মিত কি না তা নিরীক্ষা করা।
·
ভিড়
নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা তৈরি করা—বিশেষত
অফিস টাওয়ার বা বহুতল ভবনে।
·
এলিভেটরের
জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা রাখতে হবে—ভূমিকম্পে
কখনোই এলিভেটর ব্যবহার করা যাবে না।
৫. কর্মীদের জন্য সক্ষমতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ
·
BCDM, Fire
Service এবং Red Crescent-এর সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ আয়োজন।
·
নিরাপত্তা
কমিটি গঠন করে প্রতি মাসে ঝুঁকি তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা।
৬.৪ স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা
যদিও এটি পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের অংশ নয়, তবুও
জরুরি প্রস্তুতি সফল করতে স্থানীয় পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।
·
ওয়ার্ড বা
ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি রেসপন্স টিম গঠন।
·
জরুরি
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর তালিকা হালনাগাদ করা।
·
সাইরেন,
ওয়ার্নিং সিস্টেম, পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট ব্যবস্থার প্রস্তুতি সার্বক্ষণিক বজায়
রাখা।
·
স্থানীয়
সরকারি দফতরগুলোর সমন্বয়ে নিয়মিত টেবিল-টপ এক্সারসাইজ আয়োজন।
৭. ভূমিকম্প চলাকালীন করণীয়
ভূমিকম্প যখন শুরু হয়, তখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়
খুবই কম—সাধারণত ১০–২০ সেকেন্ডের
মধ্যে ব্যক্তির আচরণই জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আতঙ্ক বা
ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অধিকাংশ আঘাত ঘটে (FEMA, 2022)। তাই জরুরি মুহূর্তে দ্রুত,
সুনির্দিষ্ট ও প্রশিক্ষিত আচরণ জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত “Drop, Cover, Hold On” পদ্ধতিই সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ প্রতিরক্ষা কৌশল
হিসেবে বিবেচিত (USGS, 2023; IFRC, 2021)।
Drop – Cover – Hold On পদ্ধতির ব্যাখ্যা
১. Drop (মাটিতে নেমে পড়ুন)
কম্পন শুরু হতেই মাটিতে নেমে পড়া অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করলে ভারসাম্য হারানো বা পড়ে গিয়ে মাথায়
আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। হঠাৎ দুলুনি শুরু হলে শরীরের উচ্চতা যত কম
হবে, আহত হওয়ার ঝুঁকি তত কমে।
২. Cover (টেবিল বা শক্ত আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন)
·
মাথা ও ঘাড়
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ: তাই এগুলো ঢেকে রাখা অপরিহার্য।
·
একটি শক্ত
টেবিল, বেঞ্চ, ডেস্ক বা ভারী আসবাবের নিচে আশ্রয় নিলে উড়ন্ত বা ভেঙে পড়া বস্তু
থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
·
যদি আশ্রয়
পাওয়ার মতো কোনো আসবাব না থাকে, তবে দেয়ালের কর্নারে কোঁকড়ানো অবস্থায় মাথা দু’হাত
দিয়ে ঢেকে রাখা উত্তম।
৩. Hold On (আসবাবটি শক্ত করে ধরে থাকুন)
কম্পন বাড়লে টেবিল বা আসবাবপত্র সরে যেতে পারে। তাই
সেটিকে ধরে রাখা জরুরি।
·
কম্পন থামা
পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
·
দৌড়ানো,
সিঁড়ি ব্যবহার করা বা বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।
৭.১ ঘরের ভেতরে থাকলে
ভূমিকম্পের সময় ভবনের ভেতরেই থাকা নিরাপদ—এটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বহুবার প্রমাণিত (USGS,
2023)। কারণ দৌড়ে বের হতে গেলে কাচ, দেয়াল বা সিঁড়ির ভিড়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বেশি
থাকে।
ভেতরে থাকলে করণীয় আচরণ
১. দৌড়াবেন না বা বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন না
·
কম্পনের সময়
সিঁড়ি সবচেয়ে অনিরাপদ—এটি ধসে পড়তে
পারে বা মানুষে ভিড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
·
দরজার নিচে
দাঁড়ানোর পুরোনো ধারণাটি ভুল, কারণ আধুনিক বাড়ির দরজার ফ্রেম আগের মত তেমন
শক্তিশালী নয়।
২. জানালা, কাচ ও ঝুলন্ত বস্তু থেকে দূরে থাকুন
·
গ্লাস ভেঙে
বিচ্ছিন্ন বস্তুর আঘাত গুরুতর হতে পারে।
·
বইয়ের আলমারি
বা ভারী শোকেসের কাছ থেকে দূরে থাকুন—এগুলো
পড়ে প্রাণঘাতী হতে পারে।
৩. লিফট ব্যবহার করবেন না
·
ভূমিকম্পে
লিফটে বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
·
কম্পন থামার
পর সিঁড়ি ব্যবহার করেই নিচে নামতে হবে।
৪. টডলার/শিশুকে রক্ষা করুন
·
শিশুকে বুকে
টেনে শক্ত করে ধরে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন।
·
মাথায় বালিশ,
ব্যাগ বা হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন।
৭.২ ঘরের বাইরে থাকলে
ঘরের বাইরে থাকলে সঠিক দূরত্ব বজায় রেখে নিরাপদ
স্থানে থাকা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
১. ভবন ও কাঠামো থেকে দূরে যান
·
ভবনের বাইরের
অংশ (ফ্যাসাড) ভূমিকম্পে সহজেই ভেঙে পড়ে।
·
দেয়ালের
টুকরা, কাচ, সাইনবোর্ড বা বারান্দা ভেঙে মানুষের উপর পড়তে পারে।
২. বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, গাছ ও সেতুর
কাছ থেকে দূরে থাকুন
·
বৈদ্যুতিক
খুঁটি ভেঙে পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
·
বড় গাছও
ঝাঁকুনিতে পড়ে যেতে পারে বা শাখা ভেঙে মাথায় আঘাত লাগতে পারে।
৩. খোলা জায়গায় থাকুন
·
খেলার মাঠ,
খালি প্রাঙ্গণ বা রাস্তার এমন অংশে দাঁড়ান যেখানে কোনো বস্তু ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা
নেই।
·
কম্পন থামা
পর্যন্ত একই স্থানে অপেক্ষা করুন।
৭.৩ গাড়িতে থাকলে
গাড়িতে ভূমিকম্প অনুভূত হলে তা প্রথমে হালকা দুলুনি
হিসেবে মনে হয়। এই অবস্থায় চালকের সঠিক আচরণ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।
১. গাড়ি ধীরে পাশে থামান
·
রাস্তার
মাঝখানে জরুরি ব্রেক চাপলে পেছনের গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ হতে পারে।
·
গাড়িকে
রাস্তার পাশে বা খোলা জায়গায় থামিয়ে অপেক্ষা করা উত্তম।
২. ওভারব্রিজ, টানেল বা বৈদ্যুতিক
খুঁটির নিচে থামবেন না
·
ওভারব্রিজ বা
ফ্লাইওভার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
·
বৈদ্যুতিক
খুঁটির নিচে থামলে খুঁটি বা তার পড়ে বিপদ সৃষ্টি করতে পারে।
৩. গাড়ির ভেতরে থাকুন
·
গাড়ি শক্ত
কাঠামো হওয়ায় বাহিরে উড়ন্ত বস্তুর তুলনায় গাড়ির ভেতরে থাকা নিরাপদ।
·
কম্পন থামার
পর সতর্কভাবে গাড়ি চালিয়ে নিরাপদ এলাকায় যান।
৭.৪ ভিড় বা জনসমাগমের স্থানে
থাকলে
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ
বাজার, শপিং মল বা ধর্মীয় স্থানে ভূমিকম্প ঘটলে আতঙ্ক ছড়ায় দ্রুত।
১. হুড়োহুড়ি করবেন না
·
দৌড়াদৌড়িতে
পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
·
নিজের স্থানে
নিচু হয়ে মাথা ঢেকে আশ্রয় নিন।
২. জরুরি নির্গমনপথ অনুসরণ করুন
·
মল বা
বাজারের সিকিউরিটি স্টাফের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
·
লিফট নয়—সিঁড়ি ব্যবহার করবেন, এবং কম্পন থামার পরই বের
হবেন।
৭.৫ প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ ও
শিশুদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
·
হুইলচেয়ার
ব্যবহারকারীরা চাকা লক করে মাথা ঢেকে রাখবেন।
·
বৃদ্ধদের
সাথে থাকা ব্যক্তি তাদের ব্যালান্স ধরে রাখতে সহায়তা করবেন।
·
শিশুকে
দৌড়াতে দেবেন না—আচরণগত নিয়ন্ত্রণ খুব
গুরুত্বপূর্ণ।
৮. ভূমিকম্প-পরবর্তী করণীয়
ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়কে “Golden Hours” বলা হয়—কারণ প্রথম ২৪ ঘন্টাই জীবনরক্ষা, ক্ষয়ক্ষতি কমানো
এবং পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ (WHO, 2022)। এই সময় আতঙ্ক নয়,
বরং ধাপে ধাপে সঠিক আচরণই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পরও
আনুষঙ্গিক ক্ষতি—আফটারশক, গ্যাস
বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, ভবনের অতিরিক্ত ধস—ঘটতে পারে। তাই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অন্যদের
সহায়তা ও মানসিক স্থিতিশীলতার সমন্বিত পরিকল্পনা অত্যাবশ্যক।
৮.১ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত
করা
ভূমিকম্প থামার সঙ্গে সঙ্গে নিজের জীবন ও আশপাশের
পরিবেশ নিরাপদ কিনা তা মূল্যায়ন করা প্রথম করণীয়। এটি আতঙ্ক ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর
ভূমিকা রাখে।
১. গ্যাস লিক ও আগুনের ঝুঁকি পরীক্ষা
·
অনেক
দুর্ঘটনা ভূমিকম্পের কারণে নয়, বরং গ্যাস
লিক থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণ বা আগুন
থেকেই ঘটে।
·
রান্নাঘর,
গ্যাস লাইন ও সিলিন্ডারের চারপাশে গন্ধ বা সিস করার শব্দ খেয়াল করুন।
·
সন্দেহ হলে
তৎক্ষণাৎ গ্যাস লাইন বন্ধ করুন এবং কোনোভাবেই আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ অন/অফ করবেন
না।
২. বিদ্যুৎ সংযোগ সতর্কভাবে ব্যবহার
·
পানির সঙ্গে
বিদ্যুতের সংযোগ ঘটলে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
·
ভেজা জায়গায়
দাঁড়িয়ে সুইচ টিপবেন না।
·
ঘরের তার,
মাল্টিপ্লাগ বা ভাঙা বৈদ্যুতিক বোর্ড এড়িয়ে চলুন।
·
প্রয়োজনে
প্রধান সুইচ (main switch) বন্ধ করে দিন।
৩. ভাঙা কাচ, ধ্বংসাবশেষ ও দুর্বল
কাঠামো এড়িয়ে চলা
·
ভূমিকম্পের
পর ঘরের অনেক অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে—এগুলো
তাৎক্ষণিক ভেঙে পড়তে পারে।
·
দরজা-জানালা
খুলতে গিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে যদি দেখা যায় আটকে আছে নাড়ানো যায় না তবে জোর করে চাপ
প্রয়োগ করবেন না; কাঠামো বিকৃত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
·
পায়ের নিচে
কাচ বা তীক্ষ্ণ বস্তু থাকলে জুতা ছাড়া হাঁটবেন না।
৪. আফটারশক বিবেচনায় নিরাপদ স্থানে
অবস্থান
·
প্রধান
ভূমিকম্পের পর সাধারণত ছোট-বড় আফটারশক হতে পারে, যা দ্বিতীয়বার ধসের ঝুঁকি বাড়ায়।
·
বিল্ডিং
দুর্বল মনে হলে খোলা জায়গায় চলে যান।
৮.২ অন্যদের সহায়তা
ভূমিকম্প-পরবর্তী মানবিক সহায়তা শুধুমাত্র উদ্ধার
ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং সাধারণ মানুষের তৎপরতা অনেকসময় বেশি কার্যকর।
WHO (2022) জানায় যে, প্রথম এক ঘণ্টায় আহতদের ৮০% উদ্ধার হয় স্থানীয় মানুষের
মাধ্যমে।
১. আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান
·
রক্তপাত বন্ধ
করা, সেলাইন (ORS) খাওয়ানো, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা—এসব তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকর।
·
গুরুতর
আহতদের অযথা নড়াচড়া না করানো উচিত, বিশেষ করে যারা মাথা, ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাত
পেয়েছেন।
২. প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ ও শিশুদের সহায়তা
·
হুইলচেয়ার
ব্যবহারকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিন এবং চাকা লক করে দিন।
·
শিশুদের
আতঙ্ক কমাতে তাদের হাত ধরুন, আশ্বাস দিন এবং অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দিন।
·
বৃদ্ধদের
হাঁটতে সমস্যা হলে বাহু ধরে সহায়তা করুন।
৩. ভবন খালি করা প্রয়োজন হলে ধাপ অনুসরণ
·
আতঙ্কে ভিড়
সৃষ্টি করবেন না—এটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি
বাড়ায়।
·
সিঁড়ি
ব্যবহার করুন, লিফট নয়।
·
ভবন খালি
করার সময় সবচেয়ে দুর্বলদের আগে বের হতে দিন—শিশু,
নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী।
৪. কমিউনিটি সমন্বয় গঠন
·
পাড়ার তরুণ
বা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে “দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল” তৈরি করা জরুরি।
·
তাদের
দায়িত্ব হতে পারে—ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক
মূল্যায়ন, রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা, আহতদের হাসপাতালে পাঠানো, পানির লাইনে লিক
খুঁজে বের করা ইত্যাদি (UNDRR, 2022)।
৮.৩ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা
ভূমিকম্প-পরবর্তী মানসিক চাপকে অনেক সময় অবহেলা করা
হয়। অথচ WHO (2022) জানায়—দুর্যোগ-পরবর্তী
সময় দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার আশঙ্কা থাকে, বিশেষ করে PTSD, উদ্বেগ,
বিষণ্নতা, নিদ্রাহীনতা ও দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক। তাই মানসিক পুনর্বাসন শারীরিক উদ্ধার
কার্যক্রমের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
১. শিশুদের মানসিক সুরক্ষা
·
শিশু দ্রুত
ভীত হয় এবং প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণ অনুকরণ করে।
·
তাদের শান্ত
করে বোঝাতে হবে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে।
·
কার্টুন,
গল্প বলা বা তাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর কার্যক্রম কার্যকর।
২. প্রাপ্তবয়স্কদের সমর্থন ও কাউন্সেলিং
·
হঠাৎ সবকিছু
হারানোর শোক ও চাপ সামলাতে সমর্থনমূলক কথোপকথন জরুরি।
·
স্থানীয়
স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর থাকলে যোগাযোগ করতে হবে।
·
সামাজিক/পারিবারিক
সমর্থন নেটওয়ার্ক তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ গঠন
·
স্থানীয়
মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার বা স্কুলে ছোট দলে আলোচনা সভা আয়োজন করা যেতে পারে।
·
এই সভাসমূহে
অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, সমস্যা চিহ্নিতকরণ, পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ ইত্যাদি করা যায়।
·
এটি
কমিউনিটির মানসিক স্থিতিশীলতা ও ঐক্যকে শক্তিশালী করে।
৪. গুজব প্রতিরোধ ও তথ্যের সঠিক উৎস
ব্যবহার
·
ভূমিকম্প
পরবর্তী সময়ে ভুল তথ্য বা গুজব মানুষকে আরো আতঙ্কিত করে।
·
সরকারি
জনসংযোগ বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বা স্থানীয় প্রশাসনের ঘোষণাকেই
প্রামাণ্য ধরা উচিত (IFRC, 2021)।
৮.৪ পুনর্বাসনের প্রাথমিক
ধাপ
ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্বাসন শুরু হয় ন্যূনতম
প্রয়োজন পূরণ থেকে।
১. খাবার, পানি ও স্বাস্থ্যবিধি সুরক্ষা
·
নিরাপদ পানির
অভাবে ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ জলবাহিত রোগ ছড়াতে পারে।
·
WHO-এর
নির্দেশিকা অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতি ব্যক্তির জন্য ন্যূনতম ১৫ লিটার পানি
প্রতিদিন প্রয়োজন।
২. অস্থায়ী আশ্রয় স্থাপন
·
স্কুল মাঠ, কমিউনিটি
সেন্টার বা খোলা জায়গায় তাঁবু স্থাপন করা।
·
নারী, শিশু ও
প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা নিরাপদ জায়গা বরাদ্দ করা।
৩. ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক মূল্যায়ন
·
কোন ভবন
বাসের অনুপযোগী—তা দ্রুত চিহ্নিত করা
জরুরি।
·
স্থানীয়
প্রশাসন, প্রকৌশলী ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে Rapid Structural Assessment করা
উচিত (FEMA, 2022)।
৯. প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রস্তুতি
ও ব্যবস্থাপনা
সমসাময়িক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও প্রতিক্রিয়ায়
প্রযুক্তি একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে জনবহুল
নগরসমূহে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার, ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, তথ্যপ্রবাহ স্বচ্ছতা এবং
দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া ছাড়া প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশসহ
ভূমিকম্প–ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ক্রমাগতভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক
প্রস্তুতি ও কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিক্রিয়ায় সংহত করার দিকে এগোচ্ছে।
৯.১ ভূমিকম্প প্রাথমিক সতর্কতা
ব্যবস্থা (Early Warning System)
যদিও ভূমিকম্পের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস এখনো
বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তবে ফল্ট-লাইন
এলাকার কাছাকাছি ট্রিগার হওয়া তরঙ্গ শনাক্ত করে শেকিং পৌঁছানোর কয়েক সেকেন্ড
পূর্বে সতর্কতা দেওয়া এখন বাস্তবসম্মত। এই ‘সেকেন্ড-লেভেল’ সতর্কতা—যত কমই হোক—মানুষকে
নিরাপদ অবস্থান নেওয়ার সময় দেয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিফট থামানো, গ্যাসলাইন বন্ধ করা,
হাসপাতালের লাইফ–সাপোর্ট সিস্টেম সুরক্ষিত করা এবং ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক
স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাটডাউন করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
জাপান, মেক্সিকো ও ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঞ্চলে
মাটির নিচে স্থাপন করা সিসমিক সেন্সর নেটওয়ার্ক ভূমিকম্পের P–wave শনাক্ত করে
কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠায় এবং সফটওয়্যার-ভিত্তিক অ্যালগরিদম তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কতা
জারি করে। বাংলাদেশে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে না
থাকলেও সরকার–বিশ্বব্যাংক ও
JICA যৌথ উদ্যোগে সিসমিক
মনিটরিং নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চলছে। নগরায়নের বর্তমান গতি বিবেচনায়
ভবিষ্যৎ নগর-পরিকল্পনায় Early Warning System সংযোজন জরুরি হয়ে উঠবে।
৯.২ GIS, ড্রোন, স্যাটেলাইট
ইমেজিং
দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দ্রুত ও
নির্ভুলভাবে বুঝতে Geographic Information
System (GIS) অত্যন্ত
কার্যকর। GIS বিভিন্ন ধরনের ডেটা—ভূমিকম্পের
তীব্রতা, ভবন নির্মাণ ঘনত্ব, জনবসতি, রাস্তা–ব্রিজ–ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক—একত্রিত করে রিয়েল-টাইম ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করতে
পারে। JICA (2021)-এর গবেষণায় দেখা যায়,
নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নির্ভুল GIS মানচিত্র ৪০–৬০% দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে
সহায়তা করে।
ভূমিকম্প–পরবর্তী তাত্ক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে
ড্রোন এখন একটি গেম-চেঞ্জার প্রযুক্তি। ড্রোন:
·
ধ্বংসস্তূপে
আটকে থাকা মানুষ শনাক্ত করতে থার্মাল ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারে;
·
অপ্রবেশ্য
এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে উচ্চ-রেজোলিউশনের ভিডিও/ছবি সংগ্রহ করতে পারে;
·
সড়ক, ব্রিজ,
ভবনের গঠনগত ক্ষতি নিরূপণে AI-চালিত ছবির বিশ্লেষণকে ফিড করতে পারে।
একইভাবে, স্যাটেলাইট ইমেজিং
(Sentinel, Landsat, DigitalGlobe ইত্যাদি) বৃহৎ এলাকা জুড়ে পরিবর্তন শনাক্ত করতে
(Change Detection) ব্যাপক কার্যকর। এটি জরুরি প্রতিক্রিয়া দলকে কোন এলাকাগুলোতে
উদ্ধার অগ্রাধিকার দিতে হবে তা নির্ধারণে বিশেষ সাহায্য করে।
৯.৩ সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল
নেটওয়ার্ক ও রিয়েল-টাইম ডেটা
ডিজিটাল যোগাযোগ অবকাঠামো—বিশেষ করে মোবাইল নেটওয়ার্ক, সোশ্যাল মিডিয়া এবং
অ্যাপ-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম—ভূমিকম্পকালে
তথ্যপ্রবাহ, সতর্কতা প্রচার এবং উদ্ধার সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
(ক) জরুরি তথ্য প্রচারে মোবাইল নেটওয়ার্ক
মোবাইল অপারেটরদের Cell Broadcast System (CBS) বা
SMS-ভিত্তিক সতর্কতা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম।
ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে:
·
রাস্তা বন্ধ,
আগুন লাগা, গ্যাস লিক, সেতু ক্ষয়ক্ষতি—এসব
বিষয়ে দ্রুত সরকারি বার্তা পাঠানো যায়;
·
নেটওয়ার্ক
কভারেজ ধরে রাখতে Mobile BTS ভ্যান ব্যবহার করা যায়;
·
ক্ষতিগ্রস্ত
এলাকায় মানুষের অবস্থানগত প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে (aggregated mobility data)
উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা যায়।
(খ) সোশ্যাল মিডিয়া: কমিউনিটি-ড্রাইভেন
ডেটা
Facebook, X (Twitter), WhatsApp, Messenger,
TikTok—এসব প্ল্যাটফর্ম দুর্যোগকালে
‘ডিজিটাল সিটিজেন রিপোর্টিং’ ব্যবস্থা তৈরি করে। মানুষ যে ছবি–ভিডিও শেয়ার করে তা
উদ্ধারকাজের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ‘ground truth’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশেষত—
·
ভেঙে পড়া ভবন
বা আটকে পড়া মানুষের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে যায়;
·
লোকেশন-ট্যাগড
পোস্টগুলো GIS মানচিত্রে যুক্ত করা যায়;
·
প্রায়
রিয়েল-টাইমে কোন এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা বোঝা যায়।
(গ) রিয়েল-টাইম ডেটা ও অ্যালগরিদমিক
বিশ্লেষণ
ডেটা অ্যানালিটিক্স প্ল্যাটফর্ম ভূমিকম্প-পরবর্তী
সিদ্ধান্তকে আরও দ্রুত করে তোলে। যেমন—
·
হাসপাতাল,
ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ স্টেশনের লাইভ ক্যাপাসিটি মনিটরিং;
·
ট্রাফিক
ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণ করে উদ্ধার রুট নির্ধারণ;
·
ভুয়া খবর
(misinformation) শনাক্ত করতে AI–চালিত কন্টেন্ট ফিল্টার।
রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করে সরকার ও কমিউনিটি—উভয় স্তরেই দ্রুত সমন্বিত প্রতিক্রিয়া গড়ে ওঠে।
১০. পুনর্নির্মাণ, পুনর্বাসন
এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন
ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়টি একটি দেশের জন্য সবচেয়ে
চ্যালেঞ্জিং পর্ব। প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও
মনস্তাত্ত্বিক আঘাত দীর্ঘমেয়াদে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। তাই
পুনর্গঠন শুধু ভৌত অবকাঠামো মেরামত নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কৌশল,
যেখানে প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং নীতিনির্ধারণ—সবকিছু জড়িত। ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্নির্মাণ ও
পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা, প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিম্নে বিশদভাবে আলোচনা
করা হলো।
১০.১ নিরাপদ ও টেকসই নির্মাণ
ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
দিক হলো এমন একটি নির্মাণ-সংস্কৃতি গড়ে তোলা যা ভবিষ্যৎ বিপর্যয়কে ন্যূনতম ক্ষতিতে
সহ্য করতে সক্ষম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে BNBC (2020) অনুসরণ বাধ্যতামূলক হলেও
বাস্তবে এর প্রয়োগ এখনও অসম্পূর্ণ; ফলে অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে।
পুনর্নির্মাণ পর্যায়ে তাই নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
1.
সিসমিক
রেজিলিয়েন্ট ডিজাইন:
স্টিল-রিইনফোর্সড কংক্রিট, বেস আইসোলেশন টেকনিক, শিয়ার ওয়াল—এসব আধুনিক ভূমিকম্প-প্রতিরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার
নতুন নির্মাণে উৎসাহিত করা উচিত।
2.
অবৈধ/অনিয়ন্ত্রিত
ভবন নির্মাণ প্রতিরোধ:
পুনর্নির্মাণকালেই নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশনকে “নিয়ন্ত্রণহীন
সম্প্রসারণ” বা স্প্রল রোধ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় সিসমিক রিস্ক কম
থাকে।
3.
গণউদ্যোগে
পুনর্গঠন:
নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস হলে সরকার ও এনজিও–সমন্বিত পুনর্গঠন প্রকল্প
গ্রহণ করা জরুরি। যেসব এলাকায় ক্ষতি বেশি, সেখানে “Community Reconstruction Zone”
ঘোষণা করে একীভূত নকশা ও নিরাপদ নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে।
4.
টেকসই
উপকরণের ব্যবহার:
স্থানীয়ভাবে টেকসই এবং হালকা উপাদান (যেমন ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক,
কোল্ড-ফর্মড স্টিল স্ট্রাকচার, হালকা রুফিং শিট) ব্যবহার করে নির্মাণ খরচ ও ঝুঁকি
উভয়ই কমানো যায়।
১০.২ ক্ষতি মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা
ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো দ্রুত,
নির্ভুল এবং যাচাইযোগ্য ক্ষতি মূল্যায়ন (Damage Assessment)। এটি অগ্রাধিকার
নির্ধারণ, সম্পদ বণ্টন এবং ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের রোডম্যাপ তৈরি করতে অপরিহার্য।
১. অবকাঠামো
·
সেতু,
রাস্তা, পানি ও বিদ্যুৎ লাইন
দ্রুত মূল্যায়ন করে কোনগুলো তাত্ক্ষণিক মেরামত প্রয়োজন ও কোনগুলো সম্পূর্ণ
পুনর্নির্মাণ করতে হবে—তা নির্ধারণ
করতে হবে।
·
লাইফলাইন
অবকাঠামো—জরুরি সড়ক, হাসপাতালের রুট,
অগ্নি নির্বাপণ পথ—অগ্রাধিকার
ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
·
পুনরুদ্ধার
প্রক্রিয়ায় GIS–ভিত্তিক ম্যাপিং, ড্রোন সার্ভে এবং রিমোট সেন্সিং উল্লেখযোগ্য
ভূমিকা রাখতে পারে।
২. বাসস্থান
·
ক্ষতিগ্রস্ত
বাড়িগুলোকে “আংশিক ক্ষতি”, “গুরুতর ক্ষতি”, “অব্যবহারযোগ্য”—এইভাবে শ্রেণিবদ্ধ করতে হবে।
·
“Build Back
Better” নীতি অনুসারে দুর্বল কাঠামো মেরামতের চেয়ে নতুন সিসমিক রেজিলিয়েন্ট ঘর
নির্মাণ অধিক কার্যকর হতে পারে।
·
হাউজিং
সহায়তা স্কিম, লো-ইন্টারেস্ট পুনর্গঠন ঋণ এবং সরকারি ভর্তুকি ক্ষতিগ্রস্ত
পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. স্বাস্থ্য সুবিধা
·
হাসপাতালের
স্থাপত্যিক অখণ্ডতা (structural integrity) পরীক্ষা ও জরুরি ইউনিট (ICU, OT, ট্রমা
কেয়ার) পুনঃচালু করা জরুরি।
·
ক্ষতিগ্রস্ত
স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণের সময় ভূমিকম্প-নিরাপদ নকশা ও অস্থায়ী মেডিকেল
শেল্টার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
৪. পরিবহন ব্যবস্থা
·
ক্ষতিগ্রস্ত
রেললাইন, বাস টার্মিনাল, বন্দর এলাকা ও বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দ্রুত
মেরামত করতে হবে।
·
পরিবহন
নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধার শুধু চলাচল নয়—জরুরি
সহায়তা, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০.৩ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা
ভৌত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি সামাজিক ও
অর্থনৈতিক পুনর্বাসনই নির্ধারণ করে একটি সমাজ কত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে
পারবে। এ কারণে পুনর্গঠনে সরকার, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং কমিউনিটির সমন্বিত
পদক্ষেপ অপরিহার্য।
১. সরকারি সহায়তা
·
ক্ষতিগ্রস্ত
পরিবারগুলোর জন্য জরুরি নগদ সহায়তা, খাদ্য,
ও আশ্রয় প্রদান করতে হবে।
·
পুনর্গঠন
প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ দিলে তাদের
আয়ের পথ পুনরুদ্ধার হয়।
·
জাতীয়
পর্যায়ে “Earthquake Recovery Taskforce” গঠন করে নীতি, সম্পদ এবং তদারকি
সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে।
২. এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা
·
দ্রুত ত্রাণ
বিতরণ, মনোসামাজিক সহায়তা, শিশুবান্ধব কেন্দ্র এবং চিকিৎসা সহায়তায় এনজিও ও
আন্তর্জাতিক সংস্থার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়।
·
UNDP,
UN-Habitat, JICA, Red Cross–এর মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনে টেকনিক্যাল
সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের সক্ষমতা পুনর্গঠনে সাহায্য করতে
পারে।
৩. কমিউনিটি-ভিত্তিক পুনর্বাসন
·
সমাজের
নিজস্ব শক্তি—পাড়া কমিটি, স্থানীয়
স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—দুর্যোগ-পরবর্তী
পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
·
কমিউনিটি
পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা, বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী
ব্যক্তিদের প্রয়োজন শনাক্ত করা জরুরি।
·
স্থানীয়ভাবে
প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল (Community Emergency Response Team) পুনরুদ্ধারকালীন
সময়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
৪. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার পুনর্গঠন
·
ভূমিকম্প-পরবর্তী
ক্ষুদ্র ব্যবসা, দোকান, কর্মশালা—এসব
পুনরুদ্ধারে স্বল্পসুদ ঋণ, গ্রান্ট এবং বিশেষ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি প্রয়োজন।
·
কর্মসংস্থান
পুনর্গঠনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
·
কৃষি,
ক্ষুদ্র উৎপাদন ও অনানুষ্ঠানিক খাতের দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক
সহায়তা প্রয়োজন।
১১. উপসংহার
ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক বাস্তবতা যা মানবসমাজ
অস্বীকার করতে না পারলেও তার প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন সম্ভব। আধুনিক
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন হলো—“ঝুঁকি কখনো শূন্যে নামানো যায় না, কিন্তু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা
অসংখ্য প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করতে পারে।” বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান আমাদেরকে উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে
রাখলেও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই
একটি স্থিতিস্থাপক জাতি গঠনের ভিত্তি।
প্রথমত, ভূমিকম্প-সম্পর্কিত জ্ঞান ও প্রস্তুতি এখন
আর কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়—এটি সরাসরি জননিরাপত্তা, শহর পরিকল্পনা, অবকাঠামো নকশা ও সামাজিক
সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে নীতি-নির্ধারণ থেকে শুরু করে স্থানীয় সম্প্রদায়
পর্যন্ত সবার দায়িত্ব ও ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নগরায়ণের
দ্রুত বিস্তার এবং ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বহুগুণ
বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই শহর ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং নির্মাণ মানদণ্ডের
বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিভিত্তিক সক্ষমতা—যেমন GIS, ড্রোন সার্ভে, রিয়েল-টাইম ডেটা
অ্যানালিটিক্স, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম—ভূমিকম্প
ব্যবস্থাপনাকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রযুক্তি তথ্যকে দ্রুত পৌঁছে দেয়,
সিদ্ধান্ত গ্রহণকে নির্ভুল করে এবং উদ্ধার কার্যক্রমকে অধিক কার্যকর করে। তবে
প্রযুক্তি তখনই সর্বোচ্চ ফল দেবে যখন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয় থাকবে এবং
প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
তৃতীয়ত, ভূমিকম্প মোকাবিলায় সমাজভিত্তিক স্থিতিস্থাপকতা (community
resilience) একটি মৌলিক
ভিত্তি। পরিবার, পাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবক দল—সবাই যদি নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, তবে বড়
ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মাঝেও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও স্বাবলম্বী।
দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, নারীদের সুরক্ষা, শিশু ও প্রবীণদের
বিশেষ সহায়তা—এসব বিষয়ও এখন দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
চতুর্থত, ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠন শুধু
ধ্বংসস্তুপ সরানো বা ভাঙা স্থাপনা মেরামত নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরমূলক
প্রক্রিয়া। “Build Back Better” ধারণা অনুসারে পুনর্নির্মাণের প্রত্যেকটি পদক্ষেপ
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমানোর কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। নাগরিক সচেতনতা,
প্রবিধান বাস্তবায়ন, গবেষণা, বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার
সমন্বয় এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা
খাত দ্বারা পরিচালিত সম্ভব নয়।
এটি এক বহুমাত্রিক, সমন্বিত ও সমন্বয়-নির্ভর প্রক্রিয়া যেখানে সরকার, বেসরকারি
খাত, উন্নয়ন সংস্থা, গণমাধ্যম এবং কমিউনিটি—সবাইকে
একসাথে কাজ করতে হবে। কার্যকর প্রস্তুতি কেবল জীবন রক্ষা করে না, বরং অর্থনীতি,
সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, ভূমিকম্প ঝুঁকি কমানোর পথটি দীর্ঘ
এবং বহুমাত্রিক হলেও যথাযথ পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি, কার্যকর নেতৃত্ব এবং
জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই চারটি
স্তম্ভের ওপর দাঁড়ালে বাংলাদেশ একটি স্থিতিস্থাপক, প্রস্তুত ও নিরাপদ রাষ্ট্র
হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় আজকের
প্রতিটি সিদ্ধান্তই তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শব্দ সংক্ষেপ:
|
AI |
: |
Artificial
Intelligence |
|
BBS |
: |
Bangladesh Bureau of Statistics |
|
BCDM |
: |
Building and Construction
Disaster Management |
|
BNBC |
: |
Bangladesh National Building Code |
|
BTS |
: |
Base Transceiver Station |
|
CBDRR |
: |
Community-Based Disaster Risk
Reduction |
|
CBS |
: |
Cell Broadcast System |
|
CPR |
: |
cardiopulmonary resuscitation |
|
CDC |
: |
Centers for Disease Control and
Prevention |
|
FEMA |
: |
Federal Emergency Management Agency |
|
GIS |
: |
Geographic
Information System |
|
GNSS |
: |
Global Navigation Satellite System |
|
ICU |
: |
Intensive Care Unit |
|
IFRC |
: |
International Federation of Red Cross and Red
Crescent societies |
|
JICA |
: |
Japan International Cooperation
Agency |
|
NDMP |
: |
National Disaster Management Policy |
|
ORS |
: |
Oral Rehydration Solution |
|
OT |
: |
Operation Theatre |
|
PPP |
: |
Public-Private Partnerships |
|
PTSD |
: |
Post-Traumatic
Stress Disorder |
|
SMS |
: |
Short
Message Service |
|
SOD |
: |
Standing
Order on Disaster |
|
SOP |
: |
Standard Operating Procedure |
|
SOS |
: |
Save
Our Soul |
|
UN-Habitat |
: |
United Nations Human Settlements Programme |
|
UNDP |
: |
United
Nations Development Programme |
|
UNDRR |
: |
United
Nations Office for Disaster Risk Reduction |
|
USAR |
: |
Urban
Search and Rescue |
|
USGS |
: |
United
States Geological Survey |
|
WHO |
: |
World
Health Organization |
গ্রন্থপঞ্জী
Bilham, R.
(2019). Himalayan earthquakes: A review of historical seismicity. Seismological
Research Letters.
BNBC. (2020). Bangladesh
National Building Code 2020. Housing and Building Research Institute.
CDC. (2023). Earthquake
safety guidelines.
IFRC. (2021). Community-based
disaster risk reduction guidelines.
JICA. (2021). Use
of GIS and remote sensing in disaster management.
Khan, M., &
Islam, S. (2020). Seismic hazard assessment of Bangladesh. Journal of
Geoscience.
Shaw, R.,
Mallick, F., & Takeuchi, Y. (2018). Disaster education and community
preparedness. Springer.
UNDRR. (2022). Global
assessment report on disaster risk reduction.
USGS. (2023). Earthquake
hazards program.
WHO. (2022). Emergency
response and psychosocial support.
%E0%A6%AD%E0%A7%82%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA1.jpg)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন