প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পূর্বশর্ত: এনবিআর বিভাজনের শিক্ষা ও বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একীভূতকরণের যৌক্তিকতা
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পূর্বশর্ত: এনবিআর বিভাজনের শিক্ষা ও বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একীভূতকরণের যৌক্তিকতা
©মো: আবদুর রহমান
মিঞা অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন), বেপজা, ঢাকা-১২০৫
রাষ্ট্রের কার্যকর পরিচালনা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর যথাযথ সংস্কার ও পুনর্গঠন। তবে এমন
সংস্কার হতে হবে সময়োপযোগী, বাস্তবমুখী ও প্রয়োজন নিরূপণভিত্তিক। প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ
বা "Need Assessment" ব্যতীত যেকোনো সংস্কার উদ্যোগ অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত
সুফল আনে না, বরং সৃষ্টি করে প্রশাসনিক জটিলতা ও কর্মদক্ষতার সংকট।
বাংলাদেশে বর্তমানে এর বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় রাজস্ব
বোর্ড (NBR)-এর ক্ষেত্রে। আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিভাগকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত
যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়িত হওয়ায় বহু জটিলতা দেখা দেয়—যা অদ্যাবধি কাটিয়ে
ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা স্বরূপ, বিশেষ করে যখন সরকার
দেশের ছয়টি প্রধান বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
◆ প্রস্তাবিত একীভূতকরণ:
প্রেক্ষাপট ও পটভূমি
বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দেশের ছয়টি প্রধান বিনিয়োগ
সংস্থাকে একীভূত করে একটি "One Investment Authority" গঠন। এ সংস্থাগুলো
হলো:
১. বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
(BIDA);
২. বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা
কর্তৃপক্ষ (BEPZA);
৩. বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ
(BEZA);
৪. বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ
(BHTPA);
৫. বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন
(BSCIC);
৬. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ
(PPP Authority)
সরকারি সূত্র মতে, একীভূতকরণের মূল লক্ষ্য হলো—প্রক্রিয়াগত জটিলতা
দূরীকরণ, নীতিগত সমন্বয় এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের
আগে প্রয়োজন ব্যাপক মূল্যায়ন, স্বচ্ছ পরিকল্পনা এবং অংশীজনদের মতামতের প্রতিফলন।
◆ সংস্থাগুলোর পৃথকতা
ও স্বাতন্ত্র্য
এই ছয়টি সংস্থা একে অপরের পরিপূরক হলেও, তাদের গঠনমূলক দিক,
আইনি কাঠামো, লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি ভিন্ন।
* BIDA দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নীতিগত
ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করে।
* BEPZA EPZ পরিচালনার মাধ্যমে রপ্তানি, কর্মসংস্থান
ও FDI বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
* BEZA বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী
শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
* BHTPA উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতের
বিকাশে কাজ করে।
* BSCIC ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তা
উন্নয়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।
* PPP Authority বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বেসরকারি
বিনিয়োগ নিশ্চিত করে।
এই ভিন্ন ভিন্ন ম্যান্ডেট ও দক্ষতাসম্পন্ন সংস্থাগুলোকে একত্রিত
করা মানেই হচ্ছে কার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোকে মন্থর ও জটিল একটি কাঠামোতে পরিণত করা।
◆ Need
Assessment-এর অভাব: প্রধান দুর্বলতা
এ ধরনের মেগা-সংগঠন গঠনের আগে প্রয়োজন ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ
Need Assessment, যাতে অংশগ্রহণ করতেন সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারীরা
এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডার। বাস্তবে এমন কোনও সমীক্ষার অস্তিত্ব নেই। ফলে সম্ভাব্য
আইনি, প্রশাসনিক, মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলোর সুনির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে
না।
◆ এনবিআর বিভাজন:
সতর্কবার্তা
আয়কর ও ভ্যাট বিভাগকে পৃথক করার সময় একইভাবে প্রয়োজন নিরূপণ
ও কর্মপদ্ধতির উন্নয়ন ছাড়াই বিভাজন কার্যকর করা হয়। ফলাফলস্বরূপ দেখা দেয় সেবার ঘাটতি,
সিদ্ধান্তহীনতা, জনবল সংকট ও দক্ষতার অভাব। ঠিক এই ভুল পুনরাবৃত্তি হলে বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর
ক্ষেত্রেও দেখা দিতে পারে একই রকম ব্যর্থতা।
◆ একীভূতকরণের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
১. আইনি ও বিধিগত জটিলতা:
প্রতিটি সংস্থার রয়েছে আলাদা আইন ও বিধিমালা। একীভূত সংস্থা গঠনে আইনি সংশোধন প্রয়োজন
হবে যা দীর্ঘ মেয়াদী এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।
২. মানবসম্পদ ও প্রশাসনিক
দ্বন্দ্ব: বিভিন্ন স্কেল ও ক্যাডারে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একীভূত করার ফলে
দেখা দেবে পদমর্যাদার দ্বন্দ্ব, দায়িত্ব বিভ্রান্তি ও মনোবল হ্রাস।
৩. পরিষেবা ও বিনিয়োগকারীদের
আস্থা: একীভূতকরণের সময়কালে সেবার ধীরগতি, বিভ্রান্তি ও দায়িত্বহীনতা দেখা দিতে পারে,
যা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা
ও মনোবল: সফল সংস্থাগুলোর কর্মরত জনবল এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও হতাশায় ভুগবে, যা প্রশাসনিক
উদ্যম কমিয়ে দেবে।
◆ বিকল্প ও বাস্তবমুখী কৌশল
১. সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম:
একীভূত না করে 'One-Stop Investment Portal' গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে একটি প্ল্যাটফর্মে
সকল সেবা পাওয়া যাবে।
২. নীতিগত সমন্বয়: নীতিমালায়
সমন্বয় এনে সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়, বরং সহযোগিতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়।
৩. পাইলট প্রকল্প: প্রথমে
সীমিত পরিসরে দু-একটি সংস্থাকে সবলের (যার সাকসেস স্টোরি পরীক্ষিত) সাথে দূর্বলকে পরীক্ষামূলকভাবে
একীভূত করে ফলাফল পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
৪. প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সক্ষমতা
বৃদ্ধি: প্রত্যেক সংস্থার নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধি করে নির্দিষ্ট ম্যান্ডেটের আওতায় সর্বোচ্চ
কার্যকারিতা অর্জনে সহায়তা প্রদান।
◆ BEPZA: একটি সফল মডেল
BEPZA তার নিজস্ব আইন, স্বতন্ত্র শ্রম আইন, যুগোপযোগী ও জবাবদিহিমূলক
প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রতিশ্রুত দ্রুত সেবা প্রদান ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে
একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে উঠেছে। EPZ-এ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে এই সংস্থার অবদান প্রশংসনীয়। একীভূতকরণের নামে এমন সফল প্রতিষ্ঠানের
স্বাতন্ত্র্যতা বিলুপ্ত করা হবে মারাত্মক ভুল।
পরিশেষে বলতে চাই যে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া।
তবে এটি হতে হবে যথাযথ প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ, প্রয়োজন নিরূপণ, এবং অংশীজন পরামর্শের
ভিত্তিতে। শুধুমাত্র কাগুজে পরিকল্পনা নয়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বুঝে পদক্ষেপ গ্রহণই
সাফল্যের চাবিকাঠি।
BIDA, BEPZA, BEZA, BHTPA, BSCIC এবং PPP Authority—এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের
একীভূতকরণের প্রস্তাব একটি বৃহৎ প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই
নিশ্চিত করতে হবে: কী হারাতে পারি, আর কী পেতে পারি—সেই বিশ্লেষণ।
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, বিদেশি আস্থা ও কর্মসংস্থান যেন কোনো
একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের বলি না হয়, সেটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রন্থপঞ্জী:
১.
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA), www.bida.gov.bd
২.
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (BEPZA), www.bepza.gov.bd
৩.
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA), www.beza.gov.bd
৪.
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA), www.bhtpa.gov.bd
৫.
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (BSCIC), www.bscic.gov.bd
৬.
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (PPP Authority), www.pppo.gov.bd
৭.
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), www.nbr.gov.bd
৮.
Administrative Reforms and Institutional Performance: Lessons from Bangladesh,
World Bank Reports (বিভিন্ন বছর)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন