অনলাইন থেকে লাইফলাইন: প্রযুক্তি ও মানবিক সম্পর্ক
অনলাইন থেকে লাইফলাইন: প্রযুক্তি ও মানবিক সম্পর্ক
©মো:
আবদুর রহমান মিঞা
আধুনিক যুগে প্রযুক্তি কেবল একটি হাতিয়ার নয়, বরং
আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আজ ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে
দাঁড়ানোর দিন শেষ—কারণ ঘরে বসেই
অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন, বিল প্রদান কিংবা ব্যালান্স যাচাই করা
সম্ভব। বাজারে গিয়ে পণ্য বাছাইয়ের ঝামেলা কমেছে, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে
ঘরে বসেই আমরা কেনাকাটা করি এবং দ্রুত হোম ডেলিভারির সুবিধা পাই। শিক্ষা ব্যবস্থায়
এসেছে আমূল পরিবর্তন—ভিডিও কনফারেন্সের
মাধ্যমে লাখ লাখ শিক্ষার্থী একই সাথে ক্লাস করছে, দূরশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা চলে
এসেছে সবার নাগালে (Kushlev & Leitao, 2020)। চিকিৎসা সেবাতেও টেলিমেডিসিন এক
নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এই সুবিধাগুলো নিঃসন্দেহে আমাদের সময় ও শ্রম
বাঁচাচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলছে। আজকের মানুষ অতীতের তুলনায় কম সময় ব্যয়
করেও অনেক বেশি কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন জন্ম নেয়—
“আমরা যে সময় বাঁচাচ্ছি, সেই সময়ের সদ্ব্যবহার কোথায়
করছি”?
প্রযুক্তির আবির্ভাব আমাদের মানবিক সম্পর্ককে কতটা
শক্তিশালী করছে, নাকি উল্টো দুর্বল করে দিচ্ছে—এটি এক গভীর ভাবনার বিষয়। কারণ, একদিকে প্রযুক্তি আমাদেরকে বিশ্বজোড়া
সংযুক্ত করছে, অন্যদিকে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে ধীরে ধীরে শিথিল
করে দিচ্ছে। আমরা দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, কিন্তু পাশের ঘরের মানুষটির
খোঁজ নিচ্ছি না। আজকের সমাজে অনেকেই দিনের বড় একটি সময় ব্যয় করছে স্ক্রিনের সঙ্গে,
অথচ বাস্তবের মানুষ ও সম্পর্কের জন্য সেই সময় ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
অতএব, প্রযুক্তির অনস্বীকার্য অবদান থাকা সত্ত্বেও,
এটি যে মানবিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে, সেই সত্যকে
এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই প্রশ্ন থেকে যায়—
“প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কোথায় শেষ হচ্ছে, আর
অপব্যবহার কোথা থেকে শুরু হচ্ছে”?
এই প্রবন্ধে সেই দ্বন্দ্বের অনুসন্ধান এর প্রয়াস।
™
প্রযুক্তির সুবিধা: সময় বাঁচানো ও কাজের সহজীকরণ
অস্বীকার করার উপায় নেই যে আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের
জীবনযাত্রাকে অভূতপূর্ব সহজতা এনে দিয়েছে। অতীতে যেখানে ব্যাংকের একটি সাধারণ কাজে
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো, আজ অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই অর্থ
স্থানান্তর, বিল প্রদান কিংবা ব্যালান্স চেক করা সম্ভব হচ্ছে। এতে শুধু সময়ই
সাশ্রয় হচ্ছে না, অযথা ভ্রমণজনিত খরচ ও মানসিক চাপও কমছে।
একইভাবে, ই-কমার্স আজ মানুষের জীবনে নতুন মাত্রা
যোগ করেছে। ঘরে বসেই অনলাইনে বাজার-সদাই, পোশাক, এমনকি ওষুধ পর্যন্ত অর্ডার করা
যায়। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতা—সবার
জন্যই এটি এক সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে করোনা অতিমারির সময় অনলাইন শপিং
অনেক পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিল, যা প্রযুক্তির গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট
করেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
ডিজিটাল ক্লাস, অনলাইন কোর্স এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শহর থেকে প্রত্যন্ত
গ্রামাঞ্চল—সর্বত্র শিক্ষার সুযোগ
পৌঁছে গেছে। শিক্ষার্থীরা ইউটিউব ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বিশ্বমানের
শিক্ষা পাচ্ছে। ফলে শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এখন তা সবার হাতের
নাগালে (Przybylski & Weinstein, 2017)।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রভাব
সমানভাবে দৃশ্যমান। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগীরা ভিডিও কলে চিকিৎসকের সঙ্গে ভার্চুয়ালি
যোগাযোগপূর্বক পরামর্শ পাচ্ছে। হাসপাতালের দীর্ঘ ভিড় এড়িয়ে ঘরে বসেই প্রয়োজনীয়
চিকিৎসা নির্দেশনা ও প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করা যাচ্ছে। এতে শুধু সময়ই সাশ্রয় হচ্ছে
না, বরং দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য হয়েছে।
এছাড়া তথ্যপ্রবাহ ও যোগাযোগের গতিও বেড়েছে বহুগুণ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ই-মেইল, ভিডিও কনফারেন্স বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কারণে
বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর এখন মুহূর্তের মধ্যেই পাওয়া যায়। আগে যেখানে একটি
তথ্য পৌঁছাতে সপ্তাহ বা মাস লেগে যেত, এখন তা সেকেন্ডের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি কেবল সময় বাঁচাচ্ছে
না, বরং কাজের দক্ষতাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা
এবং তথ্যপ্রবাহ—সবক্ষেত্রেই এর সুফল
আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
™
মানবিক বন্ধনের সংকট
তবে প্রযুক্তির সুবিধা থাকলেও এর প্রভাবের একটি ঋণাত্মক
দিকও রয়েছে, যা মানবিক সম্পর্কের ওপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলছে। আমরা আমাদের সময়
বাঁচাচ্ছি, কিন্তু সেই সময়কে আমরা মানুষের সঙ্গে মানসম্পন্ন সংযোগ তৈরি করতে
ব্যবহার করছি না। বরং আমরা ডিভাইসের সঙ্গে আবদ্ধ থেকে সময় কাটাচ্ছি। ছোট্ট শিশুরা
আজ ঘুম থেকে উঠে প্রথমে মা-বাবার মুখ দেখার পূর্বে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ
রাখে। এই প্রাথমিক অভ্যাসই প্রমাণ করছে, আমরা ধীরে ধীরে বাস্তব মানবিক সম্পর্কের
পরিবর্তে ভার্চুয়াল ইন্টারঅ্যাকশনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি (Turkle, 2017)।
এমনকি পাশের ফ্ল্যাটে কেউ মারা গেলেও অনেকে তার
খবরই পাচ্ছে না, খবর পাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। সেখানেই ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া
ইন্না ইলাইহি রাজেউন’ বা ‘Rest in Peace (RIP)’ লিখে দায় সারছে। কারণ প্রযুক্তি
আমাদেরকে অব্যবহৃত তথ্য দিয়ে সংযুক্ত রাখলেও, পারিপার্শ্বিক মানুষের জীবন-যাপন,
অনুভূতি বা প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। আমরা বন্ধু বা
পরিবারের সঙ্গে সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করি, কিন্তু বাস্তব
দেখা-সাক্ষাৎ, সংবেদনশীল সহমর্মিতা বা সমবেদনার অভাব এভাবে আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
আজকের শহুরে সমাজে বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট বা
বাসাবাড়িতে মানুষ একসাথে থাকলেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতি
মানবিক সম্পর্ককে জীবন থেকে অ্যাপার্ট করে ফেলছে। একসময় গ্রামের মানুষ যে বাড়িতে
একটি টেলিভিশন আছে সে বাড়িতে সমবেত হতো, অনুষ্ঠান দেখতো, একে অপরের সঙ্গে
হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করতো। তখন মানুষ কেবল খবর বা বিনোদন পেত না, বরং সামাজিক
বন্ধনের শক্তিও অনুভব করত। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যেকে নিজ নিজ রুমে, নিজের
স্মার্টফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপের সঙ্গে আবদ্ধ। এই ভার্চুয়াল সংযোগ শারীরিক দূরত্ব
হ্রাস করতে পারে, কিন্তু মানসিক দূরত্ব বৃদ্ধি করছে, সম্পর্কের গভীরতা কমিয়ে সমাজকে
বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে (Putnam, 2000; Hampton & Wellman, 2018)।
ফলে প্রযুক্তি যেমন দ্রুততা, সুবিধা এবং
কার্যকারিতা এনেছে, তেমনি আমাদের মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের
জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আমরা যদি সচেতন না হই, তবে এই মানবিক সংযোগের অভাব
দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক
প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
™
মানবিক সম্পর্কের মূল্য
মানবজীবনে প্রযুক্তি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার
পরিবর্তে মানসিক সম্পর্কের গুরুত্ব অদম্য। মানুষ শুধু পণ্য চায় না—তাদের প্রয়োজন মানবিকতাও। অর্থাৎ, তারা চায় সেবার
সঙ্গে সহমর্মিতা, আন্তরিকতা এবং সম্পর্কের বন্ধন। গলির মুখের মুদি দোকানি যখন
অসুস্থ গ্রাহকের খোঁজ নেয়, তার পাশে দাঁড়ায় বা সহযোগিতা করে, তখন গ্রাহকের হৃদয়ে
একটা অমোঘ নিরাপত্তা ও সান্ত্বনার অনুভূতি জন্মায়। অনুরূপভাবে, প্রতিবেশী যখন
বিপদের মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়ায়, অথবা একটি সাধারণ দিনেও এক কাপ চায়ের সময়
ভাগাভাগি করে, তখন তৈরি হয় সামাজিক বন্ধন, যা শুধুমাত্র পণ্য বা সেবার মাধ্যমে
সম্ভব নয়।
এছাড়া, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সম্পর্কের মধ্যেও
মানুষের সহমর্মিতা প্রকাশ পায়। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংকের ক্যাশিয়ারের ক্লান্ত মুখ
দেখলে আমাদের ভিতরে এক প্রকার অনুভূতিশীল সংযোগ জন্মায়—যা আমাদের মানবিকতার প্রতিফলন। প্রযুক্তি সর্বোচ্চ
একটি যান্ত্রিক ইমেইল পাঠাতে পারে, বা অনলাইন নোটিফিকেশন দেখাতে পারে, কিন্তু
মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়া, ভেতরের হতাশা বোঝা বা অকপট সহমর্মিতা দেখানো—এগুলো কখনওই করতে পারে না।
আজকের যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষকে
ব্যবহারকারী (User) এবং ডিভাইসপ্রেমী হিসেবে পরিণত করছে। আমরা এখন মানুষের সঙ্গে
সংযোগের বদলে স্ক্রিনের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি। অথচ মানবতার মূল ভিত্তি হলো—মানুষ মানুষের জন্য। সহমর্মিতা, সহানুভূতি এবং
আন্তরিক সম্পর্ক প্রযুক্তি কখনও প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট
সংযোগ—চোখে চোখ রাখা, কথা বলা, পাশে
থাকা—এইসব মানবিক অভিজ্ঞতা আমাদের
মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য (Twenge, 2017)।
ফলে, মানবিক সম্পর্কের মূল্য অপরিসীম। পণ্য বা সেবা
আমাদের জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু মানবিকতা, আত্মিক সংযোগ এবং সহমর্মিতা আমাদের
জীবনকে অর্থপূর্ণ ও সম্পূর্ণ করে। প্রযুক্তি যতই অগ্রসর হোক, এই মানবিক বন্ধন
রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব যা আজ চ্যালেঞ্জ এর সম্মুখীন।
™
প্রযুক্তি: আশীর্বাদ না অভিশাপ?
প্রযুক্তি নিজে কখনোই খারাপ নয়। এটি মানবসভ্যতার
অগ্রযাত্রার অন্যতম বাহন। প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা দ্রুত তথ্য পাই, শিক্ষার সুযোগ
বাড়াই, স্বাস্থ্যসেবা সহজ করি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও দক্ষ করি। অনলাইন
ব্যাংকিং, ই-কমার্স, টেলিমেডিসিন, ভিডিও কনফারেন্স—সবই আমাদের জীবনকে সুবিধাজনক ও দ্রুততর করেছে। প্রকৃতপক্ষে, প্রযুক্তি
মানুষের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বিকাশে সাহায্য করছে।
তবে সমস্যাটি তখনই শুরু হয় যখন প্রযুক্তি নেশা বা
অভ্যাসে রূপ নেয়। প্রতিদিনের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে স্মার্টফোন, ট্যাব,
ল্যাপটপ বা অন্যান্য ডিভাইসের সঙ্গে অতিরিক্ত আবদ্ধতা। “স্ক্রিন এ্যাডিকশন” আজ
বৈজ্ঞানিকভাবে মানসিক অসুস্থতার একটি পরিচিত রূপ হিসেবে স্বীকৃত (Awasthi, 2020)।
এটি শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করছে। শিশু, কিশোর,
এমনকি প্রাপ্তবয়স্করাও তাদের পারিপার্শ্বিক মানুষ এবং প্রকৃত জীবনের মানবিক
সম্পর্কের পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় ব্যয় করছে।
সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখ আশা ভোঁসলে একবার এক
অনুষ্ঠানে বলেছিলেন—
“আমার চারপাশে মানুষ বসে আছে, কিন্তু কথা বলার কেউ
নেই। কারণ সবার হাতে ডিভাইস।”
এটি আমাদের সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরে। আমরা দৈনন্দিন
জীবনের মানুষগুলোর মুখ চিনি না, কিন্তু পণ্যের লোগো, অ্যাপ আইকন বা ব্র্যান্ডের
নাম সব মনে রাখি। বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশী যে সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি
করে—সেটিই আমরা ভুলে যাচ্ছি।
ফলে, প্রযুক্তি যখন সীমিত, সতর্ক ও সচেতনভাবে
ব্যবহার করা হয়, তখন তা আশীর্বাদ। এটি সময়, শ্রম ও সংযোগকে সহজ করে। কিন্তু যখন
এটি নেশায় পরিণত হয়, তখন এটি মানবিক সম্পর্ককে ক্ষুণ্ণ করে, সামাজিক সংযোগকে
দুর্বল করে এবং একাকীত্ব ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহারকে সচেতনতার
সাথে সীমিত রাখাই আজকের যুগে এক অপরিহার্য দায়িত্ব।
™
পরিশেষ
প্রযুক্তি আমাদের জীবনে নিঃসন্দেহে অসাধারণ সুবিধা
বয়ে এনেছে। এটি আমাদের সময়, শ্রম ও জ্ঞানের দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে। তবে, প্রযুক্তি
যেন কেবল সুবিধার উৎস হয়ে থেমে না যায়—এটির
অপব্যবহার মানবিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। তাই প্রয়োজন সচেতনতার। আমাদের লক্ষ্য
হওয়া উচিত, প্রযুক্তি যেন মানুষের সেবক হয়, মানুষ যেন প্রযুক্তির দাস না হয়।
অর্থাৎ, আমরা ডিভাইসের নেশা বা নিয়ন্ত্রণে না পড়ে বরং ডিভাইসকে যেন আমাদের কাজের
সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করি।
মানুষ হল সেই সত্তা, যার সঙ্গে জীবনের আনন্দ, দুঃখ,
সহমর্মিতা এবং সম্পর্কের গভীরতা যুক্ত। একজন মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, হাসি
ভাগ করা, সহানুভূতি দেখানো—এগুলো কোনো
যান্ত্রিক ডিভাইস কখনও দিতে পারবে না। বাস্তব সংযোগ আমাদের জীবনে মানসিক সুস্থতা,
সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্পর্কের গভীরতা বজায় রাখে। তাই আমাদের উচিত সময় ব্যয় করার
মূল উৎস মানুষকে করা, ডিভাইসকে নয়।
“আমরা যদি সত্যিই সমৃদ্ধ, মানবিক এবং সহমর্মী সমাজ
চাই, তবে প্রতিটি দিন সচেতনভাবে
মানুষের সাথে সময় কাটানো আবশ্যক।” ছোট ছোট মুহূর্ত—পরিবারের সঙ্গে চায়ের সময়, প্রতিবেশীর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, বন্ধুর
খোঁজ নেওয়া—এসবই মানবিক বন্ধনকে দৃঢ়
করে। প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু সম্পর্কের
অনুভূতি, হৃদয়ের স্পর্শ এবং সহমর্মিতার জায়গা কখনও পূরণ করতে পারবে না।
সুতরাং “Spend
Time with People, Not with Device.” প্রযুক্তি জীবন নয়; জীবন হলো
মানবিক সম্পর্কের বন্ধন, সহমর্মিতা ও আন্তরিক সংযোগ। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে—ডিভাইসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ
করা এবং সম্পর্ককে আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরে রাখা। যদি আমরা এই
দিকটি মেনে চলি, তবে প্রযুক্তি আমাদের জন্য সত্যিই আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, অভিশাপ নয়।
গ্রন্থপঞ্জী:
Awasthi, P.
(2020). Digital addiction: A threat to mental well-being. Journal of
Mental Health and Human Behaviour, 25(2), 87–92. https://doi.org/10.4103/jmhhb.jmhhb_33_20
Hampton, K.
N., & Wellman, B. (2018). Lost and saved... again: The moral panic about
the loss of community takes hold of social media. Contemporary Sociology,
47(6), 643–651. https://doi.org/10.1177/0094306118805415
Kushlev, K.,
& Leitao, M. R. (2020). The effects of smartphones on well-being:
Theoretical integration and research agenda. Current Opinion in Psychology,
36, 77–82. https://doi.org/10.1016/j.copsyc.2020.05.001
Przybylski, A.
K., & Weinstein, N. (2017). Digital screen time limits and young
children's psychological well-being: Evidence from a population-based study.
Child Development, 90(1), e56–e65. https://doi.org/10.1111/cdev.13007
Putnam, R. D.
(2000). Bowling alone: The collapse and revival of American community.
New York, NY: Simon & Schuster.
Turkle, S.
(2017). Alone together: Why we expect more from technology and less from
each other. New York, NY: Basic Books.
Twenge, J. M.
(2017). iGen: Why today’s super-connected kids are growing up less
rebellious, more tolerant, less happy—and
completely unprepared for adulthood.
New York, NY: Atria Books.


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন