নারী-নির্ভর পরিবারে নিরাপত্তা সংকট
নারী-নির্ভর পরিবারে নিরাপত্তা সংকট
©মোঃ আবদুর রহমান মিঞা
(ভিক্টিমোলজী এন্ড রেস্টোরেটিভ জাস্টিস
(ভিআরজে)’ বিষয় এবং ‘ক্রিমোনলজী এন্ড কারেকশনাল সার্ভিসেস (সিএলসিএস)’ বিষয় এর শিক্ষার্থী
ও সমসাময়িক বিষয়ের লেখক)
ভূমিকা
বাংলাদেশ একটি
পরিবার নির্ভর সমাজ ব্যবস্থা। এখানে পরিবারকে কেবল একটি আবাসস্থল নয়, বরং সুরক্ষা,
সহায়তা এবং মানসিক শক্তির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—দেশের
বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পরিবার আছে যেখানে কেবলমাত্র নারী সদস্যরাই বা পুরুষবিহীন
বসবাস করেন। এসব পরিবারের গঠনে থাকেন মা, বোন, কন্যা, শিশু বা অন্যান্য নারী
আত্মীয়। যেখানে থাকে না কোনো পুরুষ অভিভাবক—যেমন বাবা, ভাই
বা ছেলে। অনেক সময় পুরুষ সদস্য জীবিত থাকলেও তারা প্রবাসে অবস্থান করেন কিংবা
ভিন্ন শহরে কাজের কারণে পরিবারে অনুপস্থিত থাকেন।
এই ধরনের
পরিবারগুলোর প্রতিদিনের জীবনযাত্রা একটি অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়, আর
সেই আতঙ্কের নাম হলো নিরাপত্তাহীনতা। তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে শুরু করে
রাতের অন্ধকারে যেকোনো অনিশ্চিত পরিস্থিতি—সবকিছুতেই একটি
অস্বস্তি কাজ করে। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা দেখা দেয় তখনই, যখন হঠাৎ কোনো নারী সদস্য
বা শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারণ, বাংলাদেশে এখনো এমন একটি সামাজিক ও অবকাঠামোগত
পরিবেশ গড়ে ওঠেনি যেখানে নারীরা যে কোনো সময়, বিশেষ করে গভীর রাতে, নিরাপদে
হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে বা জরুরি কাজে বাইরে যেতে পারবেন।
নারীদের জন্য
দিনের বেলাতেই রাস্তাঘাট তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, আর রাতের পরিবেশ যেন আরও
ভয়াবহ। চুরি, ছিনতাই, হয়রানি, শ্লীলতাহানি, সামাজিক কটূক্তি—এসব
বিপদের কথা ভেবে রাতের বেলা বাইরে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব বা দুরুহ হয়ে ওঠে। ফলে
অসুস্থ পরিবারের সদস্যকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করাও হয়ে পড়ে
দুঃসাধ্য। এ অবস্থায় অনেক পরিবার আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—
“রাতে যেন
তাদের পরিবারের কেউ অসুস্থ না হয়।”
এতে এটা স্পষ্ট
যে, মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারের নারীরা শুধুমাত্র স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, বরং মানসিক চাপ
ও সামাজিক অসহায়ত্বের সাথেও প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেন। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত
সমস্যা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকট, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
ও সামাজিক মানসিকতার ঘাটতির প্রতিচ্ছবি।
সমস্যার
বাস্তব চিত্র
যেসব পরিবারে
কেবল মেয়েরা বসবাস করেন, তারা প্রতিনিয়তই এক অদৃশ্য ভয়ের মধ্যে থাকেন। যদি হঠাৎ
করে পরিবারের কোনো নারী সদস্য—মা, বোন বা মেয়ে—রাতের বেলায়
অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন হাসপাতালে নেওয়ার মতো নিরাপদ উপায় থাকে না। বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য দিনের বেলাতেই রাস্তাঘাটকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা যায় না।
যানজট, কটূক্তি, শ্লীলতাহানি, ছিনতাইসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। রাতের
পরিস্থিতি বলাই বাহুল্য। অন্ধকার নামলেই চুরি, ছিনতাই, মাদকাসক্তদের উৎপাত, নারী
হয়রানি—সবই
যেন বেড়ে যায় বহুগুণে। মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারের নারীরা তাই বাধ্য হয়ে রাতে দরজা
বন্ধ করে ভেতরে বন্দী হয়ে থাকেন, যদিও ভেতরে অসুস্থতার কাতর আর্তনাদ থেকে যায়।
এমন পরিস্থিতির
এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হিসাবে বলা যায় সম্প্রতি একজন প্রবাসী ভদ্রলোক শোকাভিভূত
কণ্ঠে বলছিলেন—
“ভাই, আমার মেয়েটো রাতে পেট ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে মারা গেল। আমার স্ত্রী ও মা
বাড়িতে ছিলেন, কিন্তু রাতে তারা ঘরের বাইরে যেতে সাহস পাননি, ভোরের আলোর অপেক্ষায়
ছিলেন। যদি রাতেই নিরাপদে হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ থাকত, হয়তো আজ মেয়েটা বেঁচে
থাকত।”
এই ঘটনাটি শুধু
একটি পরিবারের নয়; বরং হাজারো মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারের প্রতিদিনের আতঙ্ক আর
বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি সন্ধ্যার পর তারা যেন এক অদৃশ্য কারাগারে বসবাস
করেন, যেখানে অসুস্থতা বা বিপদ এলে তা মোকাবিলা করার কোনো কার্যকর উপায় থাকে না।
এখানে সবচেয়ে
করুণ বিষয় হলো—পরিবারগুলো কেবল বাস্তব ঝুঁকির জন্যই নয়, বরং মানসিক ভয় ও
সামাজিক সংকোচ থেকেও রাতে বাইরে যেতে সাহস পান না। সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি,
নিরাপত্তার ঘাটতি, নির্ভরযোগ্য পরিবহনের অভাব এবং আশেপাশের মানুষের নির্লিপ্ততা—সব
মিলিয়ে মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারগুলো যেন একটি “অসহায়তার চক্রে” আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সামাজিক
ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা
বাংলাদেশে মেয়ে
কেন্দ্রিক পরিবারগুলোর নিরাপত্তাহীনতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি গভীরভাবে সামাজিক ও
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। পরিবারগুলোকে প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার সম্মুখীন
হতে হয়, সেগুলো নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে একটি বৃহৎ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যেমন:
১.
নিরাপত্তাহীনতা
রাতের বেলায় নারীদের বাইরে বের হওয়া এখনও সমাজে নিরাপদ নয়। জনসমাগম কমে গেলে
অন্ধকার রাস্তায় ছিনতাই, চুরি কিংবা নারী হয়রানির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পুলিশের
টহল পর্যাপ্ত নয়, নিরাপদ গণপরিবহনও পাওয়া যায় না। ফলে জরুরি প্রয়োজনে নারীরা ঘরের
বাইরে বের হতে ভয় পান। এ ভয়ের কারণ কেবল বাস্তব ঘটনা নয়, বরং সমাজে দীর্ঘদিন ধরে
চলা একটি অসুরক্ষিত পরিবেশ, যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কখনোই সঠিকভাবে সমাধান করা হয়নি।
২.
জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অভাব
বাংলাদেশে অনেক এলাকায় এখনো ২৪ ঘণ্টা কার্যকর জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নেই। সরকারি
হাসপাতালগুলোতে রাতের বেলা চিকিৎসক বা নার্স পাওয়া গেলেও নিরাপদে সেখানে পৌঁছানোর
মতো ব্যবস্থা থাকে না। প্রতিটি ওয়ার্ড বা থানাভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থাকা
উচিত হলেও বাস্তবে এর প্রাপ্যতা সীমিত। আবার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস
থাকলেও সেগুলো ব্যয়বহুল এবং অনেক সময় দেরিতে আসে। ফলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া নারী
সদস্যদের চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
৩.
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
নারীরা একা রাতে বাইরে বের হলে সমাজের অনেকেই ভিন্ন দৃষ্টি দেয় বা সন্দেহের চোখে
দেখে। এখনও অনেক এলাকায় প্রচলিত আছে—
“মেয়েরা রাতে বের হলে
সম্মান নষ্ট হয়”
বা
“নারীরা রাতে বাইরে গেলে
নানা ধরনের বদনাম ছড়িয়ে যায়।”
এই সংকীর্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা
তৈরি করে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবারগুলো দ্বিধায় ভোগে—কারণ
তারা ভয় পান, বাইরে গেলে প্রতিবেশী কী বলবে বা সমাজ কীভাবে দেখবে।
৪.
মানসিক চাপ
মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারগুলো তাই সবসময় ভয় ও উদ্বেগে দিন কাটান। রাতে দরজা বন্ধ করে
ঘুমালেও তাদের মনে একটি আতঙ্ক বিরাজ করে—
“যদি আজ রাতেই কেউ অসুস্থ
হয়ে পড়ে?”
এই অস্থিরতা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই ভয়ের কারণে অনেক নারী হতাশা, নিদ্রাহীনতা, উদ্বেগজনিত
রোগ এমনকি ডিপ্রেশনের শিকার হন। নিরাপত্তাহীনতার এই পরিবেশ কেবল শারীরিক নয়,
মানসিকভাবেও তাদের জর্জরিত করে তোলে।
সমাজ ও রাষ্ট্র
উভয় ক্ষেত্রেই মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারগুলোর সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার মতো
কার্যকর উদ্যোগের অভাব বিদ্যমান। ফলে এই পরিবারগুলোকে প্রতিনিয়ত নিজেদের ভেতরে
সীমাবদ্ধ থাকতে হয় এবং জীবনরক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত হন।
সম্ভাব্য
সমাধান
বাংলাদেশে মেয়ে
কেন্দ্রিক পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা একটি বহুমাত্রিক সংকট। তাই এর সমাধানও হতে হবে
বহুমুখী—সরকারি
পদক্ষেপ, কমিউনিটি সহযোগিতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক
পরিবর্তন একসাথে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিচে সম্ভাব্য সমাধানগুলো বিস্তারিতভাবে
ব্যাখ্যা করা হলো:
১.
সরকারি উদ্যোগ
·
নারী-বান্ধব
জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালুকরণ
প্রতিটি ওয়ার্ড বা থানাভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করতে হবে, যেখানে
নারী-সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত থাকবে। যেমন—মহিলা
অ্যাটেনডেন্ট রাখা, নিরাপত্তার জন্য চালকের পাশাপাশি একজন পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবককে
দায়িত্ব দেওয়া। এতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের লক্ষ্যে নারীরা আস্থা নিয়ে
অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে পারবেন।
·
থানাভিত্তিক
রাত্রীকালীন নিরাপত্তা জোরদারকরণ
প্রতিটি থানায় নিয়মিত রাত্রীকালীন টহল নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় মেয়ে
কেন্দ্রিক পরিবারগুলোর ঠিকানা নথিভুক্ত করে পুলিশকে বাড়তি সজাগ থাকতে হবে, যাতে
প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া যায়।
·
২৪ ঘণ্টা
খোলা জরুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিশ্চিতকরণ
প্রতিটি এলাকায় সরকারি বা সিটি করপোরেশন পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা খোলা
রাখতে হবে। সেখানে জরুরি বিভাগে নারী-সুরক্ষিত ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে পরিবারের
কোনো নারী অসুস্থ হলে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।
২.
কমিউনিটি উদ্যোগ
·
প্রতিবেশীদের
মধ্যে আস্থাভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা
প্রতিটি এলাকায় প্রতিবেশী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। এতে পরিবারগুলো জানতে পারবে,
কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে। এমনকি রাতের বেলাতেও
নিকটবর্তী প্রতিবেশীগণ সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারবেন।
·
স্থানীয়
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর কার্যকর সম্পৃক্ততা
অনেক এলাকায় বিভিন্ন যুব সংগঠন, ক্রীড়া ক্লাব বা স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ রয়েছে।
তাদেরকে মেয়ে/নারী কেন্দ্রিক পরিবারগুলোর জরুরি সহায়তায় সম্পৃক্ত করতে হবে। যেমন—জরুরি
পরিবহন, চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ বা পুলিশের সাহায্য পেতে তারা মধ্যস্থতার ভূমিকা
রাখতে পারে।
৩.
প্রযুক্তির ব্যবহার
·
জরুরি
অ্যাপস ও হেল্পলাইন (৯৯৯) অধিকতর কার্যকর করা
জাতীয় জরুরি সেবা (৯৯৯) কে আরও সহজ এবং কার্যকর করতে হবে। কল সেন্টারে নারী বিষয়ক
আলাদা ডেস্ক থাকতে পারে। পাশাপাশি একটি বিশেষ অ্যাপ চালু করা যেতে পারে, যেখানে এক
ক্লিকেই পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হবে।
·
মহল্লাভিত্তিক
ডিজিটাল গ্রুপ সক্রিয় রাখা
প্রতিটি মহল্লায় WhatsApp, Messenger বা Telegram গ্রুপ গড়ে তোলা যেতে পারে,
যেখানে প্রতিবেশীরা একে অপরের খবর রাখতে পারবেন। জরুরি প্রয়োজনে এই গ্রুপেই দ্রুত
সহায়তার আবেদন করা সম্ভব হবে। এতে রাতের সময় একা হয়ে পড়লেও অন্তত একটি নির্ভরযোগ্য
যোগাযোগ মাধ্যম হাতে থাকবে।
৪.
সামাজিক সচেতনতা
·
নারীদের
একা বাইরে যাওয়া নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করা
সমাজে এখনও প্রচলিত রয়েছে—“রাতে নারী বাইরে বের হলে সম্মান হানি হয়”। এই সংকীর্ণ
মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। রাতের বেলায় বের হওয়া মানেই অসামাজিক কিছু নয়—বরং
অনেক সময় সেটি জীবন রক্ষার জরুরি প্রয়াস।
·
মেয়ে
কেন্দ্রিক পরিবারকে সহায়তা করাকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা
সমাজে যদি এমন মানসিকতা তৈরি হয় যে মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারকে সাহায্য করা
প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব, তবে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। প্রতিবেশীরা যদি
সহায়তার হাত বাড়ান, তাহলে অন্তত অসুস্থতার মতো পরিস্থিতিতে প্রাণহানি ঠেকানো যাবে।
এক কথায়,
সরকারি নীতি, স্থানীয় সহযোগিতা, প্রযুক্তির সুবিধা, সামাজিক মানসিকতার ইতিবাচক
পরিবর্তন ইত্যাদির সমন্বয়ে মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা অনেকাংশেই দূর
করা সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়।
উপসংহার
বাংলাদেশের মেয়ে
কেন্দ্রিক পরিবারগুলো প্রতিদিন এক অদৃশ্য ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে।
দিনের আলোতেই যখন নারীদের নিরাপত্তাহীনতা স্পষ্ট, তখন রাতের আঁধার তাদের জন্য যেন
এক আতঙ্কের নামান্তর। বিশেষ করে অসুস্থতা বা কোনো জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে এই
অসহায়ত্ব আরও নির্মম হয়ে ওঠে। প্রবাসী ভদ্রলোকের মেয়ের মৃত্যুর মতো ঘটনা আমাদের
চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—এটি কেবল একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয়,
সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
এই সংকটকে আর
উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখন সময় এসেছে সরকারকে নারীবান্ধব জরুরি সেবা কার্যকরভাবে
চালু করার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও দায়িত্বশীল ও সক্রিয় হওয়ার, এবং প্রতিটি
এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার। পাশাপাশি স্থানীয় সমাজকেও
মানবিক দায়িত্ব নিতে হবে—প্রতিবেশী হয়ে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াতে হবে, বিশেষ করে যখন
সেটা মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রযুক্তির
অগ্রগতি যেমন আমাদের হাতে নতুন সমাধানের দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি সামাজিক
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। নারীদের একা চলাফেরা করা নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
যদি দূর না করা যায়, তবে যেকোনো উদ্যোগই অর্ধেক অপূর্ণ থেকে যাবে।
পরিশেষে বলা
যায়— সমতা
(Equality) ভিত্তিক আপাতত না হয় নাই ভাবলাম (!) বাংলাদেশে অন্তত একটি ন্যায্যতা (Equity)
ভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজ গড়তে চাইলে মেয়ে কেন্দ্রিক পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও জরুরি
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, একটি অসহায়
পরিবারের অশ্রু কেবল সেই পরিবারের নয়, বরং পুরো জাতির ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তাই
আসুন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে কোনো মা, বোন বা মেয়ে রাতে অসুস্থ হয়ে
পড়ার ভয় বা আতংকে যেন পরিবারকে আর প্রার্থনা করতে না হয়—
“আল্লাহ,
যেন রাতে কেউ অসুস্থ না হয়।”
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন